কুমিল্লা: পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কুমিল্লার খামারগুলোতে এখন বইছে ব্যস্ততার হাওয়া। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে গড়ে ওঠা ছোট-বড় খামারগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। গরু-ছাগলের পরিচর্যা, খাবার সরবরাহ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বাজারজাতকরণ নিয়ে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি ও গৃহস্থ।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, এবার কুমিল্লায় প্রায় আড়াই লাখ কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে। তবে স্থানীয় খামার ও গৃহস্থদের গোয়ালে চাহিদার চেয়েও বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলার চাহিদা পূরণ করে বাইরের জেলাতেও পশু সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
খামারগুলো ও গ্রামের গৃহস্থের গোয়াল ঘুরে দেখা গেছে, দেশীয় জাতের গরুর পাশাপাশি উন্নত জাতের ষাঁড়, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির ছাগল ও ভেড়াও প্রস্তুত করা হয়েছে।
অনেক খামারিই প্রায় এক বছর ধরে পশু লালন-পালন করে ঈদের বাজারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
তবে এবার পশুখাদ্য, ভুসি, খড়, ঔষধ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ। এতে কোরবানির পশুর দাম বাড়ার আশঙ্কা করছেন ক্রেতারা।

এরই মধ্যে বিভিন্ন খামারে ভিড় করছেন ক্রেতারা। কেউ পরিবার নিয়ে পশু দেখতে আসছেন, আবার কেউ আগাম বুকিং দিয়ে রাখছেন পছন্দের গরু বা ছাগল।
ক্রেতা জাহাঙ্গীর আলম মুন্সীর বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার পশুর দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। তবে খামারে এসে সরাসরি পশু দেখে কেনার একটা আলাদা সুবিধা আছে। এখন কয়েকটা খামার ঘুরে দেখছি, পরে সিদ্ধান্ত নেবো।
আরেক ক্রেতা সাইফুল ইসলাম সোহাগ বলেন, আমরা চাই সুস্থ ও দেশীয়ভাবে লালন-পালন করা পশু কিনতে। খামারে এসে পশুর খাবার ও পরিবেশ দেখে কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। তবে দাম যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রেতা মো. ইব্রাহিম মাঝি বলেন, এখন বাজারে ভালো মানের পশুর চাহিদা বেশি। তাই আগে থেকেই দেখে রাখছি। শেষ মুহূর্তে দাম আরও বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছি।
খামারিরা জানান, সারা বছর অনেক কষ্ট করে পশু লালন-পালন করলেও লাভ নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। বিশেষ করে খাবার ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবার চাপ আরও বেশি।
খামারি আমজাদ মিয়া বলেন, একটা গরু বড় করতে এখন অনেক খরচ হয়। খাবার, ভুসি, খড় সবকিছুর দাম বেড়েছে। তারপরও আমরা ভালোভাবে পশু লালন-পালন করেছি। আশা করছি এবার ন্যায্য দাম পাবো।

খামারি রুবেল হোসেন বলেন, আমারা যেহেতু ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকায় আছি তাই আমাদের মতো দেশীয় খামারিদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ভারতীয় পশু অবৈধভাবে প্রবেশ করা। সীমান্ত দিয়ে গরু ঢুকলে স্থানীয় বাজারে দাম কমে যায়। সরকার যদি সীমান্তে কঠোর নজরদারি রাখে তাহলে আমরা ভালো দাম পাবো।
আরেক খামারি আব্দুল কাদের বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে আমরা অনেক আশা নিয়ে পশু প্রস্তুত করি। ব্যাংক ঋণ ও ধারদেনা করে খামার চালাতে হয়। বাজার ভালো হলে খামারিরা টিকে থাকতে পারবে।
অন্যদিকে, ঈদকে সামনে রেখে পশু পরিবহন, বাজার ব্যবস্থাপনা, জাল টাকা প্রতিরোধ ও পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে কাজ করছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও প্রশাসন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামছুল আলম বলেন, খামারিদের সহযোগিতা ও ক্রেতাদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাজারে সুস্থ পশু সরবরাহ ও রোগমুক্ত পশু নিশ্চিত করতে আমাদের ভেটেরিনারি টিম মাঠে কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন ক্রেতা ও বিক্রেতাদের অনুকূলে থাকে সে কারণে জেলা প্রশাসনও আমাদের সাথে কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে এবারের কোরবানির পশুর বাজার আরও সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হবে।