Friday 15 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

‘লাভের আশায় নয়, পেটের দায়ে ধান লাগাই’

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৫ মে ২০২৬ ১১:৩৫

গাইবান্ধা: গাইবান্ধা সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন পাকা বোরো ধানের সমারোহ। কৃষকের ব্যস্ততা ধান কাটা ও মাড়াই নিয়ে। কিন্তু মাঠে সোনালি ধান থাকলেও কৃষকের মুখে নেই হাসি। কারণ উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। অনেক কৃষকই এখন হতাশ কণ্ঠে বলছেন-‘লাভের আশায় নয়, পেটের দায়ে ধান লাগাই।’

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে খরচ হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার টাকা। এছাড়া সেচে ১ হাজার, সার ও কীটনাশকে ২ হাজার, জমি চাষে দেড় হাজার, বীজতলা তৈরিতে ২ হাজার এবং রোপণে আরও ২ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রতি বিঘায় ধান উৎপাদনে মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা।

বিজ্ঞাপন

অথচ প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ১৫ থেকে ১৮ মণ ধান উৎপাদন হলেও বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম মাত্র ৫০০ টাকা। সে হিসেবে একজন কৃষক ধান বিক্রি করে পাচ্ছেন সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার টাকা। ফলে প্রতি বিঘায় কয়েক হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। ২০২৫ মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে গড়ে খরচ হয়েছিল প্রায় ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা। তখন ধান কাটা-মাড়াইয়ের খরচ ছিল সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা, সেচ খরচ ছিল প্রায় ৭০০ টাকা এবং সার ও কীটনাশকে ব্যয় হতো দেড় হাজার টাকার মতো। এক বছরের ব্যবধানে শ্রমিক মজুরি, ডিজেল, সার ও কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েক হাজার টাকা।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সাত উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের আশা ছিল ভালো ফলনের মাধ্যমে কৃষকরা লাভবান হবেন। তবে বাজারমূল্য কম থাকায় হতাশ হয়ে পড়েছেন চাষিরা।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে ধান করতে যে খরচ হয়েছে, সেই টাকা উঠছে না। কিন্তু কৃষি ছাড়া তো আমাদের আর কোনো আয়ের পথ নেই বলতে গেলে লাভের আশা ছেড়ে পেটের দায়ে ধান লাগাই ।’

বল্লমঝড় ইউনিয়নের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “ধান কাটা-মাড়াইয়ের খরচই এখন সবচেয়ে বেশি। শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। বাজারে ধানের দাম কম থাকায় আমরা খুব কষ্টে আছি।”
রামচন্দ্রপুর এলাকার কৃষক সোহেল রানা বলেন, “সার, ডিজেল, কীটনাশক সব কিছুর দাম বেড়েছে কিন্তু ধানের দাম বাড়েনি। লোকসান জেনেও চাষ করতে হচ্ছে।”

কৃষক আমজাদ হোসেনের ভাষায়, “সারা মৌসুম মাঠে পরিশ্রম করি। ধান ঘরে তুলেও লাভ হয় না। সংসার চালাতে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।”

গাইবান্ধা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান বলেন বলেন, “বাংলাদেশের কৃষক এখন উৎপাদন ব্যয় ও বাজারমূল্যের দ্বৈত চাপে পড়েছেন। একদিকে শ্রমিক সংকট ও কৃষি উপকরণের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে ধানের বাজার কৃষকের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের লাভ কমে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার যদি উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ন্যূনতম সহনীয় মূল্য নির্ধারণ করে, তাহলে কৃষক কিছুটা স্বস্তি পাবে। পাশাপাশি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও ভর্তুকি বাড়ানোও জরুরি।”

সারাবাংলা/এএ
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর