সুনামগঞ্জ: দেখার হাওরের গুয়াছুড়া অংশে ঠান্ডা কনকনে বাতাসের মধ্যেই কোমর সমান পানিতে ধান কাটছিলেন ১৫ জন কৃষক। তাদের সবারই মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত পলিথিনে মোড়ানো। একটু দূরে দাঁড়ানো এক কৃষক (রইছ মিয়া, বাড়ি গুয়াছুড়া) কাটা ধানের মোঠা বাঁধার কাজ করছিলেন। রইছ মিয়ার চোখের কোনে টলটল করছিল পানি।
সব ধান কাটতে পেরেছেন কী-না, জানতে চাইলেই চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল গলায় থাকা গামছা পর্যন্ত। তিনি বলেন,‘দেখইন না হাওরের অবস্থা, সবইতো সাদা, ছয় কেয়ার (২৮ শতাংশে এক কেয়ার) পানিত ডুবছে, ধানের ওপরে তিন চাইর হাত পানি। কীলাখান (কীভাবে) কাটমু। ছয় কেয়ার কাটছিলাম শুকাইতাম পারছি না। ইখানো আরও ছয় কেয়ার আধাআধি (অর্ধেক দেবার) চুক্তিতে কাটরাম। ইগুন শুকানি যাইবো কী না- জানি না। ১৯ কেয়ার জমিন করছি, সবই ‘কিরাজ’ (এক ধরনের বর্গা)। প্রতি কেয়ার চাইর মণ দরে। মালিকরে সম্পূর্ণ ধান দেওন লাগবো। মালিকে কম মানতো নায়। কম দিলে সামনের বছর আর জমিন দিতো নায়।’
তিনি আরও বলেন, দেড় লাখ টাকা ঋণ করে এনে এবার জমি করেছিলেন, দুশ্চিন্তা এখন তিন ধরনের। মালিকের ধান দেওয়া, জমি করার খরচের ঋণ মেটানো এবং সারা বছর খেয়ে বেঁচে থাকা।
দেখার হাওরের গুয়াছুড়া এলাকা থেকে ফেরার সময় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও বৃষ্টি ছিল না, বাতাসের মধ্যেই হাওরের কান্দায় (কিছু শুকনা জায়গা) গেরা উঠা (চারা গজানো) ধান চটের ওপরে ছড়িয়ে বাতাস লাগানোর চেষ্টা করছিলেন ষাটোর্ধ্ব জমিলা খাতুন ও আসমা বেগম। ওখানেই কাঁচা পচে যাওয়া ধানের মোঠা টেনে সরাচ্ছিলেন গুয়াছুড়ার কোমর আলী (৭০)। কথা বলার চেষ্টা করতেই (কোমর আলীর সঙ্গে) বললেন,‘বারো আনা (৭৫ ভাগ) জমি ডুবি গেছে। পুরুত্তাইন (ছেলে-মেয়ে) লইয়া কিলা বাঁচতাম। চাইর মণ দরে জমিন আনছি। ৭০ হাজার টেকা (টাকা) খরচ কইরা ২০ কেয়ার জমিন করছি। মালিকরে ধান না দিলে তালাতালি কইরা আরেকজনে কইবো আমারে দেইন জমি, হে তো (কমর আলী) ধান দিতো পারে না, সময়মতো কাটতো পারছে না, আপনার (মালিকের) ক্ষতি অইলো (হলো), মালিক বুইজ্জা না বুইজ্জাঔ (বুঝে না বুঝে) জমিন অন্যজনরে দিতো পারে, এই বিপদ থাকি কেমনে বাঁচতাম ভাই।’
জলাবদ্ধতায় গুয়াছুড়ার এই দুই বর্গাচাষিকে কেবল বিপন্নই করেনি, বরং ভেঙেচুরে একদম শেষ করে দিয়েছে ।
দেখার হাওরপাড়ের আস্তমা গ্রামের বড় বর্গাচাষি কেএম ফখরুল ইসলাম বললেন, দেখার হাওরে শতকরা ৭০ ভাগ কৃষক কিরাজ (বর্গাচাষ) করেন। একসময় বাগি করা হতো (আধাআধিতে), রংজমায়ও (আগে চুক্তি করে টাকা দিয়ে করা) করা হতো। এখন ফসল করতে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সবাই কিরাজ করেন।
২৬ এপ্রিল থেকে মেঘালয় চেরাপুঞ্জিতে হওয়া বৃষ্টির পানির ঢলে সুনামগঞ্জে পাহাড়ি নদীসহ ছোট বড় ৯৭ নদীতে পানি বেড়েছে। অন্যদিকে দেশের ভেতরে হওয়া ভারী বর্ষণে এবং অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতায় পড়েছে ১৯৯ টি ছোট বড় হাওর।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. ওমর ফারুক বললেন, বাঁধ ভেঙেছে দুইটি। এগুলো হচ্ছে- মধ্যনগরের এরন বিল এবং একই উপজেলার জিনারিয়া বাঁধ। এই বাঁধগুলো বড় হাওরের না হলেও এসব বাঁধ ভেঙে তিনটি ছোট হাওরে পানি ঢুকেছে। জলাবদ্ধতার পানিতে ডুবেছে নয় হাজার ৪৯ হেক্টর জমি, সবমিলিয়ে পানিতে ডুবে বুধবার বিকেল পর্যন্ত সরকারি হিসেবে ৫০ হাজার টন ধানের ক্ষতি হয়েছে। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কেটি টাকা। তবে কৃষকদের দেওয়া তথ্যমতে, এই ক্ষতি আরও অনেক বেশি।
উজানে বৃষ্টি হচ্ছে, সুনামগঞ্জেও আছে বৃষ্টি। সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পয়েন্টে বুধবার বিকেলে চার দশমিক ৮৬ সেন্টিমিটার অর্থাৎ হাওরের বিপৎসীমার দুই সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জেলার শাল্লা উপজেলার সবকয়টি হাওর জলাবদ্ধতায় ডুবে যাওয়ায় কৃষকরা চাপটার হাওরের বাঁধ কেটে ধনু নদী দিয়ে মেঘনায় পানি নামানোর চেষ্টায় করেছিলেন। ওই হাওরপাড়ের কাদিরপুরের স্কুল শিক্ষক রমণ দাস বুধবার সন্ধ্যায় জানান, বাঁধ কেটে কোনো লাভ হয়নি। পানি নামছে একেবারে ধীরগতিতে। চাপটার হাওরের পানি আর ধনু নদীর পানি প্রায় সমান সমান।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, বাঁধ কেটে জলাবদ্ধতার পানি ভাটিতে বা নদীতে ছাড়ার কোনো উপায় নেই। উজানে বৃষ্টি হওয়ায় নদীর পানিও বেড়েছে। এই অবস্থায় সুনামগঞ্জের নদীগুলোর পানি ধনু নদী হয়ে মেঘনায় নামতে সপ্তাহখানেক লাগবে। এরপর হাওরের জলাবদ্ধতার পানি নামতে থাকবে।
ম্যাথোলজি অ্যান্ড আর্থ সিস্টেম রিসার্চ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের এমডি অবসরপ্রাপ্ত আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরি বলেছেন, সুনামগঞ্জে ৩০ এপ্রিল ১০০ থেকে ১২০ মিলিমিটার, পহেলা মে ও ২রা মে ১২০ থেকে ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। উজানে অর্থাৎ মেঘালয় ধরনের একই ধরণের বৃষ্টিপাত থাকার পূর্বাভাস আছে। প্রসঙ্গত, সুনামগঞ্জে প্রতিবছর ফসল রক্ষার নামে শতকোটি টাকার বাঁধ হয়। নদী খনন না করে এসব বাঁধ দেওয়া নিয়ে স্থানীয় পরিবেশবিদ ও কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। অপরিকল্পিত বাঁধে হাওরে জলাবদ্ধতা বাড়ছে বলেও দাবি করছেন স্থানীয়রা। এবারও হাওরে ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০৩ কিলোমিটার বাঁধ করা হয়েছে বলে দাবি করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার।