রাবি: মাঠের সংঘর্ষের কারণে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা পরাজিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল দলকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতা কর্তৃপক্ষ। খেলা চলাকালে ফ্রি-কিককে কেন্দ্র করে মাঠে সংঘর্ষ ও শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় ম্যাচ শেষ হওয়ার ৬ ঘণ্টা পর রাত ১২টায় ফল পরিবর্তন করে এমন সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় খেলা পরিচালনা ও শৃঙ্খলা কমিটির যৌথ সভা শেষে রাত ১২টায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন খেলা পরিচালনা কমিটির সাংগঠনিক সদস্য চবি অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) মধ্যকার আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল মাঠে খেলা চলছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে। খেলায় রাবি ১-০ গোলে এগিয়ে থাকা অবস্থায় ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ফ্রি-কিককে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, ফ্রি-কিক প্রতিহত করার সময় রাবির খেলোয়াড় অভিমালা (জার্সি নং-১১) শাবিপ্রবির খেলোয়াড় সাকিব হোসেনকে (জার্সি নং-১৭) ঘুষি মারেন। এতে গুরুতর আহত সাকিবকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তার ঠোঁটে ৪টি সেলাই দিতে হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। পরে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পর জরুরি যৌথ সভায় ম্যাচ রেফারি, দুই দলের ম্যানেজার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং প্রতিযোগিতার নিয়মাবলি পর্যালোচনা করে সর্বসম্মতিক্রমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দলকে অভিযুক্ত করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে রাবির খেলোয়াড় অভিমালার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়া সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগে শাবিপ্রবির ফারহান তামিম দীপ্ত ও আসাদুল হাবিবকে টুর্নামেন্টের বাকি সব ম্যাচ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে পরাজিত দলকে বিজয় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনা সম্পর্কে রাবি ফুটবল দলের অধিনায়ক মো. জোবায়ের আহম্মেদ বলেন, ‘খেলার শুরু থেকেই শাবিপ্রবির খেলোয়াড়রা বেশ আক্রমণাত্মক আচরণ করছিলেন। ম্যাচ শেষ হওয়ার ২-৩ মিনিট আগে একটি ফাউলকে কেন্দ্র করে মাঠে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে শাবিপ্রবির খেলোয়াড়রা মাঠ ছেড়ে চলে যান। ফাউলের ঘটনায় শাবিপ্রবির এক খেলোয়াড়ের নাক দিয়ে রক্ত পড়লেও সেটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ছিল।’
জোবায়ের আরও বলেন, ‘ফাউলের পর রেফারি কোনো খেলোয়াড়কে কার্ড বা অন্য কোনো শাস্তি দেননি। পরবর্তীকালে আমরা যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) বিপক্ষে সেমিফাইনাল খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তবে রাত প্রায় ১২টার দিকে জানতে পারি, ম্যাচের ফল পরিবর্তন করে শাবিপ্রবিকে জয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জীবনে প্রথমবার দেখলাম, খেলার মধ্যে একটি ফাউলের ঘটনার কারণে ম্যাচের ফল পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। আমরা কোনোভাবেই এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছি না। সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে একটি প্রতিবাদলিপি জমা দিয়েছি। আমাদের মনে হয়েছে, চবি প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রোকসানা বেগম টুকটুকি বলেন, ‘কোন নিয়মে রাবিকে পরাজিত ঘোষণা করা হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই। রাবি খেলোয়াড়দের যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সেটি নিয়মানুযায়ী অন্যায়। এটি কোনো নিয়মের পর্যায়েই পড়ে না। আমরা এ বিষয়ে একটি আবেদন দিয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে হয়তো তারা আমাদের আবেদনের উত্তর দেবে।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের পরিচালক হাবিবুর রহমান জালাল বলেন, ‘আমরা আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের নিয়মে উল্লেখ আছে, কেউ যদি খেলাটিকে নষ্ট বা ভঙ্গুর করার চেষ্টা করে, তাহলে বিপক্ষ দল পরাজিত হলেও কমিটি তাদের বিজয়ী ঘোষণা করতে পারবে। খেলার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে বলেই এই আইন রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি রাবি টিম ম্যানেজারকেও জানানো হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেখানে খেলার আর মাত্র এক মিনিট বাকি ছিল, সেখানে রাবি একটি ফাউল করে এবং এরপর রাবির এক খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের একজন খেলোয়াড়কে ঘুষি দেয়। এতে ওই খেলোয়াড়ের রক্তপাত হয়। বিষয়টি কোনোভাবেই উচিত ছিল না, বিশেষ করে যখন রাবি আগে থেকেই এগিয়ে ছিল। শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে আঘাতটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছিল।’
খেলা বিকেলে হলেও রাত বারোটার পর কেন সিদ্ধান্ত জানানো হলো— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একটি সিদ্ধান্ত নিতে বৈঠকের প্রয়োজন হয়। সেখানে রাবি টিমের ম্যানেজার, আমাদের প্রক্টর, ক্রীড়া উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি এবং সংশ্লিষ্ট সবাই উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে রাবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত হয়েছি। আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কিছু জানানো হয়নি। তবে আজ (১৬ মে) খেলোয়াড়রা ক্যাম্পাসে এসেছে। আগামীকাল অফিস ডে-তে তাদের সঙ্গে বসে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’