ঢাকা: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, ভগবানের জ্ঞান ও বিদ্যার রূপ হলেন দেবী সরস্বতী। প্রতিবছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শ্রী পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যাদেবীর পূজা হয়। বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর কৃপা-লাভের আশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ৭৬টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিবছরই ঢাবির জগন্নাথ হলের মাঠে আয়োজন করা হয় বিশাল এ পূজার।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকাল থেকে জগন্নাথ হলের মাঠে বাণী অর্চনা, আরতি ও ভক্তদের পুষ্পাঞ্জলিতে সরস্বতীর আরাধনা করেছেন শিক্ষার্থীরা। প্রতিবারের মতো এবারও হলের খেলার মাঠের চারিদিক দিয়ে বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা পূজার আয়োজন করেছে। ৭৬টি মণ্ডপের বেশির ভাগই বিভিন্ন বিভাগের ‘থিমের’ আদলে গড়া।
ঐতিহ্যগতভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল এ পূজার মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। বরাবরের মতোই জগন্নাথ হলের পুকুরের মাঝে বসানোর জন্য দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা তৈরি করেছে চারুকলা অনুষদ।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় হল প্রশাসন এবং পূজা উদযাপন কমিটি সারাবাংলাকে জানায়, শুক্রবার প্রতিমা স্থাপনের মাধ্যমে এবারের সরস্বতী পূজার আনুষ্ঠানিক পর্ব শুরু হবে। তবে প্রতিবছর পূজোর আগের দিন সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হলেও এবার তা দেখা যায়নি।
হলের প্রাধ্যক্ষ ও পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক দেবাশীষ পাল সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা এবার সময় স্বল্পতার কারণে সংবাদ সম্মেলন করতে পারিনি। তবে প্রেসরিলিজ ও বড় বিলবোর্ডের মাধ্যমে সব নির্দেশনা জানানো হয়েছে।’
পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক দেবাশীষ পালের সই করা বিবৃতিতে জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন ও শিক্ষা), কোষাধ্যক্ষ ও প্রক্টরবৃন্দের সার্বক্ষণিক ও কার্যকর তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে জগন্নাথ হল প্রশাসন হল উপাসনালয় তথা কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপ থেকে শুরু করে সমগ্র হল প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করে চলেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় লোকবল ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আমাদের পাশে রয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), শাহবাগ থানা ও ফায়ার সার্ভিস।
তিনি জানান, সমগ্র জগন্নাথ হল সিসি ক্যামেরার আওতাধীন থাকবে; প্রবেশমুখে মেটাল ডিটেক্টরসহ অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার থাকবে; ছোট শিশুদের দুগ্ধ সেবনের জন্য বিশেষ নিরাপদ একটি কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। কোনো ধরনের পটকা বা আতশবাজির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়াও, যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ স্টিকার সরবরাহ করা হয়েছে।
এবার জগন্নাথ হলের উপাসনালয়ে দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে থাকছে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ বিতরণ, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা এবং রক্তদান কর্মসূচি। এছাড়াও, হলের ভেতরে দুই দিনব্যাপী দর্শনার্থী শিশু-কিশোরদের চিত্তবিনোদন উপযোগী বেশকিছু রাইড, খেলনা ও খাবার দোকানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে এবারের পূজায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শ্রাবস্তী বন্দ্যোপাধ্যায় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের পূজার থিম সম্পর্কে সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা শুধু থেমে থাকা কলম কিংবা পোড়া সংবাদপত্রের কথা বলিনি। কথা বলতে চেয়েছি সমস্ত নিপীড়নের বিরুদ্ধে। অস্পৃশ্য হরিজন থেকে রক্ত জল করে জীবনের শেষ জীবনীশক্তি নিংড়ে দেওয়া চা শ্রমিক, যিনি যোগ্য মজুরিটুকু পায় না কিংবা প্যালেস্টাইলে ভাঙা ধ্বংসস্তুপে পড়ে থাকা নিষ্পাপ শিশুর লাশ। সবকিছুকে ঘিরে একটা বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। যুদ্ধ না, শান্তি। মব নয়, সুবিচার।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী অনিরুদ্ধ বিশ্বাস সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রতিমা স্থাপন হয়েছে রাত ১২টা ১ মিনিটে, পূজারম্ভ হয়েছে সকাল ৮ টায়, পুষ্পাঞ্জলি সকাল ৯টায়, স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন বেলা ১১টায়।’
ফাইন্যান্স বিভাগ বেছে নিয়েছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে আলোকসজ্জা ও আলপনার মাধ্যমে তুলে ধরার থিম এবং ইংরেজি বিভাগ বেছে নিয়েছে হাতে এঁকে মণ্ডপ সাজানোর পরিকল্পনা। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী লক্ষ্মী কান্ত রায় সারাবাংলাকে বলেন, ‘অন্যবার ফোম বা শলা দিয়ে মণ্ডপ বানানো হলেও এবার প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ হাতে এঁকে মণ্ডপ বানানো হয়েছে।’
ফাইন্যান্স বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আলোকসজ্জার কারণে অন্ধকারে আমাদের মন্ডপ আরও বেশি সুন্দর লাগবে।’