ঢাকা: সারা দেশে যখন ঈদুল আজহার আগমনী আমেজ, মানুষ যখন পশু কেনায় ব্যস্ত, বাজারে বাজারে চলছে ঈদ শপিং, ঠিক তখনই রাজধানীর পল্লবীর বাউনিয়াবাঁধ বস্তির শত পরিবারের জীবনযাত্রা থামিয়ে দিয়ে গেল ভয়াবহ আগুন। মুহূর্তেই মাথার ওপরের ছাদটুকু হারিয়ে এখন খোলা আকাশই তাদের একমাত্র আশ্রয়। যেদিকেই চোখ যায় শুধু কয়লা, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া টিন, আর পুড়ে যাওয়া আসবাবপত্রের ধ্বংসস্তূপ। কেউ মাটির বুক থেকে খুঁজে ফিরছেন শেষ সম্বলটুকু, কেউ আবার ধ্বংসাবশেষের ভেতর থেকে লোহা-লক্কড় কুড়িয়ে ভাঙারির দোকানে বিক্রির চেষ্টা করছেন।
সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যায় আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে বাউনিয়াবাঁধ বস্তি। ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিটের প্রায় আড়াই ঘণ্টার অক্লান্ত চেষ্টায় রাত সাড়ে নয়টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও, ততক্ষণে পুড়ে খাক হয়ে যায় অন্তত দেড়শ পরিবারের স্বপ্ন। দু’দিন আগেও যেখানকার মানুষরা ঈদ উদযাপানের স্বপ্ন বুনছিল মঙ্গলবার (২৬ মে) সেখানে গিয়ে দেখা যায় শুধুই হাহাকার।
এই বস্তিতে দীর্ঘ দুই দশক ধরে বসবাস করছেন মো. আলী। আগুনে তার উপার্জনের প্রধান উৎস একটি মুদি দোকান এবং ১৫টি ভাড়ার ঘর পুড়ে সম্পূর্ণ কয়লা হয়ে গেছে। কান্না চেপে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘এই শহরে ২০ বছর ধরে হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে যা কামিয়েছিলাম, সব এক আগুনে শেষ। দোকানে লাখ টাকার মালামাল ছিল। প্রতিবছর আমরা কয়েকজন মিলে কোরবানি দিই, আজই গরু কেনার কথা ছিল। এখন কোরবানি তো দূরের কথা, ঈদের দিন আমাদের রাস্তায় ঘুমাতে হইব।’
রফিকুল ইসলাম নামের এক বাসিন্দা সারাবাংলাকে জানান, ভাঙারির দোকানে কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাতেন। কিন্তু এখন কিছুই নাই। সব পুড়িয়ে ছাই করে দিয়ে গেছে আগুন। আরেক বাসিন্দা সালমা বেগমের কান্না যেন শুকিয়ে গেছে। পরিবারের সদস্যদের এখন কী হবে?- নিঃস্ব চোখে শুধু এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি।
সালমা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা অভাবি মানুষ। ঈদের দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে যে মাংসটুকু পাই, তা দিয়েই পরিবার নিয়ে দু’দিন ভালো-মন্দ খাই। এবার তো রান্না করার পাতিল-চুলা কিছুই নেই, মাংস পাবই বা কোথায়, আর রাঁধবই বা কোথায়? এবারের ঈদ আমাদের আসমানের নিচে।’
এদিকে মঙ্গলবার সকাল থেকেই বস্তিজুড়ে শুরু হয়েছে পোড়া আবর্জনা সরানোর কাজ। ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে অনেকেই পুড়ে যাওয়া টিন ও লোহা সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন। যদিও এদিন সকাল থেকেই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, তরুণ স্বেচ্ছাসেবক এবং প্রতিবেশীরা ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে শুকনো খাবার, পানি ও জরুরি সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাধ্যমতো পাশে দাঁড়াচ্ছেন, যা এই চরম বিপদের দিনে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা জোগাচ্ছে।
তবে শুধু এক বেলার খাবার বা সাময়িক সাহায্য এই মানুষগুলোর মুখে হাসি ফেরাতে পারবে না। ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা, তাদের এখন প্রধান চিন্তা, আজ রাতে তারা কোথায় ঘুমাবে। কিংবা আগামী দিনগুলোতে সন্তানদের মুখে কীভাবে অন্ন তুলে দেবেন।