ঢাকা: কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীর কামারপল্লীগুলো এখন ব্যস্ততম সময় পার করছে। এই উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ কোরবানির পশু প্রস্তুত করা; আর পশুর মাংস প্রস্তুত করার প্রধান হাতিয়ার হলো দা-বটি-ছুরি-চাপাতি। উৎসবের ঠিক আগমুহূর্তে তাই রাজধানীর অলিগলি আর ব্যস্ত কামারপাড়াগুলোতে এখন দম ফেলার সময় নেই কারিগরদের। দিনরাত চলছে লোহা পেটানোর টুংটাং শব্দ।
পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে মিরপুর, রামপুরা কিংবা মোহাম্মদপুরের ছোটো-বড় কামারশালাগুলো এখন সরগরম। কোনো কোনো দোকানের সামনে ঝোলানো হয়েছে সারি সারি ধারালো দা, বটি ও ছুরি। আগে থেকেই যারা অর্ডার দিয়েছিলেন, তারা আসছেন সরঞ্জাম বুঝে নিতে। আবার অনেকেই পুরনো সরঞ্জামগুলোতে নতুন করে ধার দেওয়ার জন্য ভিড় করছেন।
কামারশিল্পী শরীফ মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘বছরজুড়ে কাজের চাপ থাকলেও কোরবানির আগের এই ১৫-২০ দিন আমাদের ব্যস্ততা থাকে আকাশচুম্বী। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লোহা পিটিয়েও কুলাতে পারি না। আর ঈদের আগের দিন তো বেচাবিক্রি অনেক চড়া থাকে।’
শরীফ মিয়ার মতো অন্য কামারশিল্পীরাও একই রকমের ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ দা-বটি বানাচ্ছেন, কেউ গ্রাহকদের ছুরি-চাপাতি দেখাচ্ছেন।
আরেক কামারশিল্পী সিরাজুল হক বলেন, ‘আজ ঈদের আগের দিন। আজ আর বানাচ্ছিনা নতুন কিছু। যা আছে সংগ্রহে, গতকাল রাত পর্যন্ত যা বানিয়েছি, সেগুলোই আজ বিক্রি করব।’
সরজমিনে দেখা যায়, এরা সবাই যে কামারশিল্পী তা নয়। কোনো কোনো কামারশিল্পী আছেন, যারা নিজেরাই দা-বটি-ছুরি-চাপাতি বানান, আবার নিজেরাই তা বিক্রি করেন। আবার কেউ কেউ আছে ব্যবসায়ী, যারা কামারপাড়া থেকে এসব সরঞ্জাম পাইকারি দরে কিনে এনে বাজারে বেশি দামে বিক্রি করে।
বাজারে এখন বিভিন্ন মানের সরঞ্জাম পাওয়া যাচ্ছে। দেশি ইস্পাতের পাশাপাশি বিদেশি প্রযুক্তির মজবুত ধাতুর তৈরি সরঞ্জামের চাহিদাও রয়েছে। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দামও ওঠানামা করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বড় সাইজের চাপাতি ৮০০-১৫০০ টাকা, বড় সাইজের বটি ৫০০-৯০০ টাকা, মাঝারি সাইজের ছুরি ৩০০-৬০০ টাকা এবং ছোটো সাইজের ছুরি ১০০-২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া ৬, ৮ ও ১২ পিসের চপার সেটও বিক্রি হচ্ছে। ৬ পিসের সেটের দাম ২৫০০-৩০০০ টাকা, ৮ পিসের সেটের দাম ৩৫০০ টাকা এবং ১২ পিসের সেটের দাম ৪০০০-৫০০০ হাজার টাকা। আর হাসুয়ার দাম রাখা হচ্ছে ৫০০-৭০০ টাকা।
বিক্রেতারা জানান, উপকরণের দাম বাড়ার কারণে এবার সরঞ্জামের দাম কিছুটা বেশি। তবুও উৎসবের আমেজে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে কার্পণ্য করছেন না ক্রেতারা।
কারওয়ান বাজারে খুরশীদ হোসেন নামে এক ক্রেতা সারাবাংলাকে বলেন, ‘কোরবানির সময় হাড় কাটা বা মাংস তৈরির জন্য ভালো চাপাতি ও ধারালো ছুরির বিকল্প নেই। তাই একটু দাম বেশি হলেও মজবুত এবং টেকসই দেখে কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ।’
এদিকে, অনেকেই এখন গত বছরের রাখা পুরনো সরঞ্জামগুলো মেরামত করে নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে শুধু ধার দেওয়াই নয়, হাতল বা বাট পরিবর্তন করার ধুমও পড়েছে কামারশালাগুলোতে। প্রতিটি কাজের জন্য নেওয়া হচ্ছে আকারভেদে ৫০-২০০ টাকা।
রাজধানীর এই কামারশালাগুলোর টুংটাং শব্দ যেন কোরবানির ঈদ আসার আগমনী বার্তা। প্রযুক্তির আধুনিকায়নে অনেক কিছু বদলালেও কোরবানির ঈদে বাঙালির রান্নাঘর আর আঙিনায় দেশি কামারদের তৈরি এই সরঞ্জামগুলোর প্রয়োজন ফুরোয়নি এখনও।