ঢাকা: মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পবিত্র আশুরা উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত তাজিয়া মিছিলসহ বিভিন্ন শোক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে সম্পন্ন করতে ব্যাপক ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। এ উপলক্ষে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকাল ১১টায় পুর্রান ঢাকার হোসেনী দালান ইমামবাড়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব কথা জানান তিনি।
ডিএমপি কমিশনার জানান, এবারের পবিত্র আশুরা উপলক্ষে ঢাকা মহানগরের লালবাগ, ওয়ারী, রমনা, তেজগাঁও, মতিঝিল ও মিরপুর থেকে ২৮টি ইমামবাড়া কর্তৃক ১ থেকে ৭ মহররম পর্যন্ত ১০টি, ৮ মহররম ১০টি, ৯ মহররম ১৯টি এবং ১০ মহররম ২৪টিসহ মোট ৬৩টি তাজিয়া মিছিল বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি তাজিয়া মিছিলের রুট নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি তাজিয়া মিছিল ও প্রধান প্রধান সমাবেশস্থলকে কেন্দ্র করে ব্যারিকেড, পিকেট, লাইনিং এবং রুফটপ বা ছাদ-নজরদারি ডিউটি মোতায়েন রয়েছে। হোসাইনী দালান ইমামবাড়াসহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল ইমামবাড়া ও সমাবেশস্থলগুলোকে ড্রোন ক্যামেরা ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেকোনো ধরনের নাশকতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, র্যাব এবং সিটিটিসি-এর ডগ স্কোয়াড ও বোম্ব ডিসপোজাল টিম দ্বারা প্রতিটি ভেন্যু ও রুট সুইপিং বা তল্লাশি করা হবে। ইমামবাড়া বা সমাবেশস্থলগুলোতে আর্চওয়ে গেট এবং মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিজিটাল তল্লাশি এবং ম্যানুয়াল চেকিং নিশ্চিত করা হবে।’
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘হোসাইনী দালান ইমামবাড়ায় একটি অস্থায়ী সাব-কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। হোসাইনী দালান ইমামবাড়া, আঞ্জুমান হায়দারী, বড়কাটারা ইমামবাড়া, শিয়া মসজিদ, বিবিকা রওজা এবং মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের বিহারী ক্যাম্পসহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানসমূহকে পুলিশের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে । গুরুত্বপূর্ণ ইমামবাড়াগুলোতে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত রাখা হয়েছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের সোয়াট, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড (K9), ক্রাইম সিন টিম এবং ডিবিসহ অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিটসমূহ স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে।’
তাজিয়া মিছিলের বিশেষ রুট ও ট্রাফিক পরিকল্পনা নিয়ে তিনি আরও বলেন, আগামী ২৬ জুন সকাল ১০টায় হোসাইনী দালান ইমামবাড়ার উত্তর গেট, হোসাইনী দালান মোড়, বকশীবাজার লেন, আলিয়া মাদ্রাসা মোড়, বকশীবাজার (কলপাড়) মোড়, উমেশ দত্ত রোড, উর্দু রোড মোড়, হরনাথ ঘোষ রোড, লালবাগ চৌরাস্তা মোড়, গৌর-এ-শহীদ মাজার মোড়, এতিমখানা মোড়, আজিমপুর চৌরাস্তা মোড়, ইডেন মহিলা কলেজ, নীলক্ষেত মোড়, মিরপুর রোড, ঢাকা কলেজ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ২নং রোড, বিজিবি ৪নং গেট, সাত মসজিদ রোড (জিগাতলা) হয়ে চূড়ান্ত গন্তব্য ধানমন্ডি লেক (কারবালা)-এ গিয়ে মিলিত হবে। এই রুটগুলোতে সুনির্দিষ্ট ট্রাফিক ডাইভারশন থাকবে।’ মিছিল চলাকালীন তীব্র যানজট এড়াতে নগরবাসীকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের জন্য অনুরোধ করেন তিনি।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘তাজিয়া মিছিলের দীর্ঘ পথ ও জমায়েতের কথা বিবেচনা করে আপদকালীন সময়ে ফায়ার ফাইটার বা ফায়ার টেন্ডার, অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন রাখা হবে। পাশাপাশি, ধানমন্ডি লেক কারবালা সংলগ্ন জলাশয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের দক্ষ ডুবুরি দল মোতায়েন থাকবে।’
আয়োজক কমিটির প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি আয়োজক কমিটিকে তাদের নিজস্ব পর্যাপ্তসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক (আইডি কার্ড বা নির্দিষ্ট পোশাকসহ) মিছিলে ও ইমামবাড়ায় মোতায়েন রাখতে হবে, যারা পুলিশের সাথে সমন্বয় করে শৃঙ্খলা বজায় রাখবে। পাইক মিছিল সংক্রান্ত বিদ্যমান সকল নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। মিছিলে ব্যবহৃত নিশানের উচ্চতা ১২ ফুটের বেশি হওয়া যাবে না। কোনো প্রকার ধারালো ধাতব বস্তু, দাহ্য পদার্থ, ছুরি, চাকু, লাঠি, ছোরা, তরবারি, বর্শা, ব্যাগ, পোটলা বা সুটকেস নিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণ করা যাবে না। এছাড়া আগত ব্যক্তিদের ব্যাগ, সুটকেস, ছাতা, কুকার জাতীয় সন্দেহজনক প্যাকেট বা বক্সসহ প্রবেশে বাধা প্রদান করতে হবে। উচ্চমাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্র বা পিএ সিস্টেম ব্যবহার করা যাবে না এবং কোনো প্রকার ঢাক-ঢোল বাজানো থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে আতশবাজি বা যেকোনো ধরনের পটকা ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘২৬ জুন সকাল ১০টা থেকে তাজিয়া মিছিল শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্ধারিত রুটগুলোতে ট্রাফিক ডাইভারশন থাকবে।’ তীব্র যানজট এড়াতে ও সম্মানিত মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ঢাকা মহানগরীর চালক ও সাধারণ জনগণকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করার জন্য যানবাহন চালকদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
ডিএমপি কমিশনার আরও বলেন, ‘অনলাইন গুজব প্রতিরোধে বিশেষ বিশেষজ্ঞ টিম দ্বারা সাইবার পেট্রোলিং এবং সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিংকার্যক্রম চলমান থাকবে।’
এছাড়া কোনো ইমামবাড়া বা মিছিলের রুটে সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা ব্যাগ পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কর্তব্যরত পুলিশ কিংবা ডিএমপির ট্রাফিক কন্ট্রোলরুম- ০১৭১১০০০৯৯০, ০১৭১১০০০৯৯১, পুলিশ কন্ট্রোলরুম- ০১৩২০০৩৭৮৪৫, ০১৩২০০৩৭৮৪৬ ও জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করার জন্য আহ্বান জানান ডিএমপি কমিশনার।