চট্টগ্রাম ব্যুরো: দেশে বহুল আলোচিত ‘চাঁদাবাজি’ সমস্যার নেপথ্যে পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি বেকারদেরও সম্পৃক্ততা দেখছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সরকার গঠন করতে পারলে এর বিরুদ্ধে এমন কঠোর বার্তা দেবেন, যার মাধ্যমে অন্তত ৩০ ভাগ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
নির্বাচনি সমাবেশে যোগ দিতে এসে রোববার (২৫ জানুয়ারি) সকালে চট্টগ্রামের হোটেল রেডিসন ব্লু বে ভিউ’র মেজবান হলে ‘ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ অনুষ্ঠানে এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
তারেক রহমানের কাছে চিটাগং ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্র প্রশ্ন করেন- বাংলাদেশের জনগণ রুট লেভেলে একটা প্রবলেম ফেস করছে, সেটা হচ্ছে চাঁদাবাজি। আমি জানতে চাই রুট লেভেল থেকে এই প্রবলেমটা সলভ করার বিষয়ে আপনি কী উদ্যোগ নেবেন? আপনার প্ল্যানটা কি?
জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘এখানে দুটো বিষয়। এই প্রবলেম সলভ হবে না যদি আমরা দুটো ইস্যুকে অ্যাড্রেস না করি। প্রথমত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া, মানুষকে নিরাপদ করা, এটা যদি আমরা নিশ্চিত করতে না পারি এবং অ্যাট দ্যা সেইম টাইম করাপশনকে (দুর্নীতি) যদি আমরা অ্যাড্রেস করতে না পারি, করাপশনকে যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে আমরা যত প্ল্যান, যা-ই করি না কেন, কিছুই হবে না।’
এরপর ‘চাঁদাবাজি’ শব্দটি উল্লেখ না করেই তিনি বলেন, ‘সেকেন্ড বিষয়টা হচ্ছে, এটা যারা করছে, আমরা এদের হয়তো দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। একটা হচ্ছে, বেকার সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু মানুষ এটার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তাদের একটা ইনকাম দরকার, তারা তাদের জোর দিয়ে সেখান থেকে ইনকামটা করতে চায়। আরেকটা হচ্ছে প্রফেশনাল ক্রিমিনাল যারা, তারা এটা করতে চায়।’
এ সমস্যা থেকে উত্তরণের বিষয়ে তারেক বলেন, ‘তো, প্রফেশনাল ক্রিমিনাল যারা, তাদের ক্ষেত্রে আইন অ্যাপ্লিকেবল হবে, যেটা আমি মাত্র বললাম। অবশ্যই আমরা সরকার গঠন করলে, এটা জিনিস বি প্র্যাকটিক্যাল প্লিজ, এই সমস্যাটা কমবেশি বিভিন্নভাবে সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। আমরা যে ওভারনাইট সবকিছু খুলে ফেলতে পারবো নট দ্যাট। বাট আমি মনে করি, যেহেতু আমার দেখার সুযোগ হয়েছে একটা গভর্নমেন্ট, আমি গভর্নমেন্টে ছিলাম না, বাট কাছাকাছি থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে, একটা গভর্নমেন্টের মেসেজিং অনেক ক্ষেত্রে অনেক সঠিক পথে নিয়ে আসতে পারে।’
‘গভর্নমেন্টের কাছ থেকে যদি মেসেজ যায় যে, উই উইল নট টলারেট দিজ, তারপর তো গভর্নমেন্টের বিভিন্ন প্রিকশন বা স্টেপস থাকবে। কিন্তু যখন মেসেজ যাবে যে, আমরা এই ধরনের জিনিস টলারেট করবো না, আমরা করাপশন টলারেট করবো না, অটোমেটিক এটলিস্ট টুয়েন্টি-থার্টি পারসেন্ট সমস্যা রিলিজ হয়ে যাবে। সো, আমি যেটা প্রথমেই কথাটা শুরু করেছিলাম, আমাদের যে প্ল্যানগুলো আমরা করেছি, এটা ৩১ দফার ভেতরে হোক কিংবা কোর যে কয়েকটা প্রজেক্ট আমাদের আছে, ৮টা পয়েন্ট যে আমরা দিয়েছি, সেক্ষেত্রে প্রথমে আমাদের ওই দুটো ইস্যু অ্যাড্রেস করতে হবে। একটা- মানুষ যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারে, সেটা ছেলে হোক আর মেয়ে হোক, স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে, এটা এবং অ্যাট দ্যা সেইম টাইম করাপশন। আমি নিশ্চয় বোঝাতে পেরেছি।’
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ‘এ মুহূর্তে অ্যাডভান্টেজ হল, আমাদের ইয়ুথ ফোর্স অনেক বেশি, যা আগামী ১৫-২০ বছর থাকবে। এই ওয়ার্ক ফোর্সের সুবিধা আমরা পাব। বাংলাদেশকে আমরা কীভাবে আগামী দিনে সাজাতে চাই সেটা বলব। বললে অনেক কথা বলতে পারি, এ খারাপ ও খারাপ। কিন্তু তাতে সমাধান আসবে না। অনেক সমস্যা আছে সেগুলো নিরসনে কিছু প্ল্যান গ্রহণ করেছি। ভবিষ্যতে আপনারা যারা দেশকে পরিচালনা করবেন তারা কীভাবে দেশকে পরিচালনা করবেন তা শুনতে চাই।’
এরপর প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আসা ছাত্রছাত্রীরা তারেক রহমানকে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পান। তিনি নিজেই মঞ্চে ঘুরে ঘুরে প্রশ্ন গ্রহণ করেন এবং সরাসরি জবাব দেন।
পারমিতা চাকমা নামের মাস্টার্সের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আপনি (তারেক রহমান) দেশে আসার পর পাহাড় এবং সমতলের সবাইকে একসাথে নিয়ে দেশ গড়ার কথা বলেছেন। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেহেতু বহু জাতিভিত্তিক দেশ, ত্রে আমি একজন চাকমা নারী প্রতিনিধিত্বকারী, আমি একজন আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দবোধ করি। তো সেক্ষেত্রে আদিবাসীদের সংবিধান স্বীকৃত ভূমির অধিকার ও ভুমি নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে উত্তেজনা-উদ্বেগ সেটা দূর করতে এবং আমাদের নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহনে আপনার দলের ভূমিকা কতটূকু থাকবে এবং পাহাড়ি তরুণদের শিক্ষা, চিকিৎসাক্ষেত্রে এবং সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে অংশগ্রহন কীভাবে জোরদার করবেন বা আমাদের ক্ষেত্রে স্কিল ডেভেলপমেন্টের কোনো বিষয় আছে কি-না আমি জানতে খুবই আগ্রহী।’
জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘দেখুন আমরা যদি বিষয়টাকে এইভাবে দেখি যে, একাত্তর সালে যখন যুদ্ধ হয়েছিলো দেশ স্বাধীন করার জন্য তখন কে কোন ধর্মের এটা কিন্তু কেউ দেখেনি। আবার কে সমতল বা কে পাহাড়ের এটাও কেউ দেখেনি। ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালে যখন আন্দোলন হতো ঠিক সেইসময়ও কে কোন ধর্মের কেউ দেখেনি, ঠিক একইভাবে কে কোন সমতলের বা কে পাহাড়ের সেইটাও কেউ দেখেনি। বাংলাদেশে একজন সমতলের আপনার মতো তরুন প্রজন্মের সদস্য যে সুবিধা পাবে, পাহাড়ের মানুষ হয়ে আপনিও সেইম সুবিধা পাবেন আপনার যোগ্যতার ভিত্তিতে।’
‘কারণ আন্দলন যখন শুরু হলো ২০২৪ সালে, এটা তো কোটা প্রথা বাতিল দিয়ে শুরু হয়েছে। আমরা বলেছি, ২০১৪ সালে আমি বলেছিলাম যে কিছু বা অন্য ভিন্ন ধরনের মানুষ আছে, তাদের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু ফাইভ পার্সেন্টের মতো কোটা রেখে বাকি সবক্ষেত্রেই ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, মেধার ভিত্তিতে হওয়া উচিত, সেটা সমতলেই হোক সেটা পাহাড়েই হোক।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী তাসনুভা তাসরীন প্রশ্ন করেন, ২০২০ সালে মহামারীর মধ্যে তারা মাশুরমের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু পুঁজির সংকটে বেশিদিন চালাতে পারেননি। জামানত দেওয়ার নিয়মের কারণে তরুণ উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে গিয়ে যে জটিলতায় পড়েন, সে কথা তুলে ধরে তাসনুভা বলেন, বিএনপি নির্বাচিত হলে ভবিষ্যতে উদ্যোক্তাদের সহায়তায় কী পদক্ষেপ নেবে।
জবাবে তারেক রহমান বলেন, দেশে ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা আছে। নির্বাচিত হলে আইন সংশোধন করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা করার পরিকল্পনা তাদের আছে। পাশাপাশি যারা পড়ালেখা করতে বিদেশে যেতে চায়, তাদের জন্য ‘স্টুডেন্ট লোন’ দেওয়া যায় কি-না সে ভাবনাও আছে।
এরপর চট্টগ্রাম মা ও শিশু মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ মোহাম্মদ রাফসান প্রশ্ন করেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সংকট, উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা সমন্বয় এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বিএনপির পরিকল্পনা কি?
জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রাম ঢাকাসহ সব বড় শহরে জলাবদ্ধতা আছে। এটা কাটাতে একটা কাজ করতে হবে তা হলো খাল খনন। বৃষ্টি হলে পানি জমে যায়। পানিগুলো তো কোথাও যেতে হবে। তাই দরকার খাল খনন। সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমমিটার খাল আমরা খনন করব।’
ইয়ুথ পলিসি টকে চট্টগ্রাম ও আশেপাশের ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ৩৪০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেন।