ঢাকা: নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং লিডার শ্রাবণ ওরফে ‘কুত্তা শ্রাবণ’-কে ৩ সহযোগীসহ গ্রেফতার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটিলিয়ন (এসআরবি)।
কুত্তা শ্রাবণ ও তার বাহিনীর অপরাধের বিরুদ্ধে যদি কোনো ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ দিত, তবে তাকেই সরাসরি টার্গেট বানিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হতো। অভিযোগের খবর পেলে সে বাদীর বাড়িতে গিয়েও তাণ্ডব চালাতো।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বলেন এসআরবি-১১ এর পদাতিক অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন— অস্ত্রধারী ও কিশোর গ্যাং লিডার শ্রাবণ ওরফে কুত্তা শ্রাবণ (২০) ও তার গ্যাংয়ের তিন সদস্য সিয়াম (২০), দিপু (১৯) কামরুজ্জামান (১৯)।
মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল (২২ সেপ্টেম্বর) গভীর রাত ১টার দিকে র্যাব-১১-এর একটি বিশেষ অভিযানে রূপগঞ্জের চনপাড়া এলাকা থেকে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং লিডার শ্রাবণ ওরফে ‘কুত্তা শ্রাবণ’-কে সহযোগীসহ গ্রেফতার করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘গ্রেফতার আসামি শ্রাবণ দীর্ঘদিন ধরে রূপগঞ্জ ও এর আশপাশের এলাকায় নিজস্ব কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে আসছে। সে রূপগঞ্জ ও তৎসংলগ্ন এলাকার কিশোর ও উঠতি বয়সিদের নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং গড়ে তোলে। সাম্প্রতিক সময়ে রূপগঞ্জে ফল ব্যবসায়ী রনিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে শ্রাবণ ও তার অনুসারী গ্যাং সদস্যরা। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের পর এলাকাবাসী গ্যাং লিডার শ্রাবণের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। তাছাড়া আসামি শ্রাবণের বিরুদ্ধে আগে দায়েরকৃত মামলা তুলে না নেওয়ায় সে তার গ্যাং সদস্যের সাথে যোগসাজশে রূপগঞ্জের তারাব পৌরসভার টাটকি এলাকায় গভীর রাতে মামলার বাদী আমেনা বেগমের বসতবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার অপচেষ্টা চালায়। রূপগঞ্জ এলাকায় ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সে ও তার গ্যাং সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে বাড়িঘরে অতর্কিত হামলা, ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাট চালায়।’
তিনি বলেন, “রূপগঞ্জ এলাকায় ‘কুত্তা শ্রাবণ’ এর নেতৃত্বে কিশোর গ্যাং দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাণ্ডব চালিয়ে চরম আতঙ্ক তৈরি করে আসছে। রূপগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নাম এই কুত্তা শ্রাবণ। তার বিরুদ্ধে হত্যা, হামলা, অগ্নিসংযোগ, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মারামারির সহ ১৮টি মামলা রয়েছে। গ্রেফতারকালে তাদের হেফাজত হতে ১টি বিদেশি পিস্তল, ১ রাউন্ড গুলি, ১টি ম্যাগাজিন এবং ৬টি লম্বা রামদা উদ্ধার করা হয়।”
গ্রেফতার আসামির নামের ‘কুত্তা’ শব্দের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি মূলত তার বাবার নামের সাথেও যুক্ত ছিল, যিনি নিজেও একাধিক মামলার আসামি। একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ছিলেন। এই সূত্রেই তার নামের সাথে কুত্তা শব্দটি এসেছে।’
অপরাধের ধরন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কুত্তা শ্রাবণ ও তার বাহিনী কোনো ব্যক্তি যদি তার অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ দিত, তবে তাকেই সরাসরি টার্গেট বানিয়ে হামলা করা হতো। অভিযোগের খবর পেলে সে বাদীর বাড়িতে গিয়ে তাণ্ডব চালাতো এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম বা পঙ্গু করে দিতো।’
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি ঘটনায় মামলা করায় বাদীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে একই পরিবারের চারজনকে কুপিয়ে জখম করেছিল তারা। আমেনা বেগম নামের এক নারী মামলা করায় তার বাড়িতেও হামলা চালানো হয়। এমনকি গত মে মাসে এক ফল ব্যবসায়ীকে হত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এলাকাবাসী মানববন্ধনও করেছিল। তার এই তাণ্ডবের ভয়ে সাধারণ মানুষ তার বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ দিতে সাহস পেত না।’
মাসুদ পারভেজ জানান, কুত্তা শ্রাবণের বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ ও আশেপাশের থানায় মোট ১৮টি মামলা রয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঘটে যাওয়া বহুল আলোচিত ‘নাদিম অপহরণ’ মামলারও সে প্রধান আসামি। ওই অঞ্চলে মূলত চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল তার প্রধান কাজ। ২০২৪ সালেও যৌথ বাহিনীর অভিযানে সে গ্রেফতার হয়েছিল, কিন্তু প্রায় ছয় থেকে সাড়ে ছয় মাস পর জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
রুপগঞ্জে কিশোর গ্যাং গ্রুপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রূপগঞ্জের দুটি প্রধান কিশোর গ্যাং গ্রুপের একটি পরিচালনা করতো কুত্তা শ্রাবণ, অন্যটি নবী গ্রুপ। এই বাহিনীর অধীনে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন সদস্যের একটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল, যারা তাকে নিজেদের আইডল মনে করতো। গ্রেফতার এড়াতে শ্রাবণ কখনোই এক স্থানে অবস্থান করতো না। একেক রাতে একেক এলাকায় আত্মগোপন করে থাকতো।’
বর্তমানে অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কঠোর করতে গ্রেফতার অভিযানে বডি ক্যামেরা ব্যবহারের মাধ্যমে ভিডিও ফুটেজ প্রমাণ হিসেবে আদালতে জমা দেওয়ার নতুন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে রূপগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান তিনি।