ঢাকা: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারি কারণ হিসেবে জানানো হয়েছে যে, জানুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা থাকায় পূর্ব নির্ধারিত সময়ে নীতি ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র সারাবাংলাকে জানায়, বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মুদ্রানীতি ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির শঙ্কায় সেটি স্থগিত করা হয়েছে। জানুয়ারি মাসের মূল্যস্ফীতির তথ্য দেখে বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, মুদ্রানীতি প্রণয়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব কাঠামোগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। স্টেকহোল্ডারদের মতামত, বিভিন্ন সমীক্ষা ও অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করে নীতি তৈরি করা হয়। নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব নীতির প্রভাব বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমানে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকবে। অক্টোবর-ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ দশমিক ১৭ থেকে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে ওঠার কারণে সুদহার কমানোর ঝুঁকি নিতে চাইছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সংকট শুধু মুদ্রানীতি নয়, এটি কাঠামোগত ও নৈতিক সংকট। ঋণখেলাপি সংস্কৃতি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গ্রুপের দায়মুক্তি এবং ব্যাংক রেজুলিউশন সিদ্ধান্তে লোকসানের বোঝা সাধারণ আমানতকারীদের ওপর চাপানোর ফলে ব্যাংক ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা কমেছে। ফলে আমানত প্রবাহ কমছে, ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে, যা বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথে বড় বাধা।
ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ, বাস্তবে হয়েছে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। উচ্চ সুদ, ব্যাংক ব্যবস্থায় আস্থাহীনতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টিতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী, স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ), স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) এবং ওভারনাইট রেপো হারের পরিবর্তন নেই। ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্বল্পমেয়াদি আমানত রাখলেও সুদের ব্যবধান খুব কম হবে; ঋণ ব্যয় একইভাবে উচ্চ থাকবে।
অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘ডলারের বাজার এখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, আমদানির খরচও আগের মতো চাপে নেই। এ প্রেক্ষাপটে সংকোচনমূলক নীতিতে কিছুটা ঢিল দেওয়া যেতেই পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করছে, মূল্যস্ফীতি যদি ধীরে ধীরে ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে নেমে আসে, তাহলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বস্তি ফিরবে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি সহজ হবে এবং কর্মসংস্থানেও গতি আসবে। তবে সে পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো সময় লাগবে।’
বর্তমান নীতির পেছনে একটি দীর্ঘ প্রেক্ষাপটও রয়েছে। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার সময় রেপো হার ছিল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। এরপর তিন দফায় ৫০ বেসিস পয়েন্ট করে বাড়িয়ে তা ১০ শতাংশে নেওয়া হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকঋণের সুদহারে। বর্তমানে গড় ঋণসুদ ১৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক নীতি অব্যাহত থাকবে। ফলে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর দিকনির্দেশনা ছাড়া ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।