ঢাকা: জাতীয় নির্বাচনের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর পরিবর্তন, কর্মকর্তা বদলি ও মবের ঘটনার জেরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের পদত্যাগ বা অপসারণের মধ্যেই গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে ‘মব’ তৈরি করে ভবন থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর দেড়টার পর থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর ছড়িয়ে পড়ে। দায়িত্বে থাকা গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সে সময় একটি সংবাদ সম্মেলন শেষ করে নিজের কক্ষে ছিলেন। এর মধ্যেই একটি গণমাধ্যমে নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগের খবর প্রচারিত হয়, যা পরে একাধিক টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
দুপুর ২টার দিকে গভর্নর ব্যাংক ত্যাগ করেন। ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, হাবিবুর রহমান ও কবির আহমেদ তাকে লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দেন।
গভর্নর ভবনের সামনেই বিকেল ৩টার দিকে উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে ঘিরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কয়েকজন কর্মকর্তা তাকে ঘিরে ভবন থেকে বের করে দেন। আহসান উল্লাহ অভিযোগ করেন, অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম তাকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলতে নেতৃত্ব দেন। ঘটনাস্থলে নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার হোসেন, পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক তানভীরসহ প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।
আহসান উল্লাহ বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শেষ করেছি। ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হলেও রাজনৈতিক কারণে নিয়োগ পাইনি। আমার ক্যারিয়ারে কোনো অনিয়মের অভিযোগ নেই।’ নতুন গভর্নরের অধীনে কাজ করার ইচ্ছা নেই বলেও জানান তিনি।
তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রক্রিয়ায় তিনি ভূমিকা রেখেছেন। সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান ও ফজলে কবিরের সময়েও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র সাংবাদিকদের জানান, নতুন গভর্নর সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন। ‘মব’ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি জরুরি পর্ষদ সভার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল সংবাদ সম্মেলন করে গভর্নরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান ও ব্যাংক মার্জার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরে আইনগত মতামতের ভিত্তিতে তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়।
তবে শোকজের পরদিনই সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। তারা হলেন- পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক মাসুম বিল্লাহ ও গোলাম মোস্তফা।
এর আগেও ২৫ ফেব্রুয়ারি জারি করা এক আদেশে ৪ পরিচালক ও এক অতিরিক্ত পরিচালককে বিভিন্ন বিভাগে বদলি করা হয়। আদেশ অনুযায়ী পরিচালক মো. জয়নুল ইসলামকে হিউম্যান রিসোর্সেস ডিপার্টমেন্ট-১ থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগে,পরিচালক মো. শহিদ রেজাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগ থেকে এইচআরডি-১,পরিচালক মো. বায়েজিদ সরকারকে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে মতিঝিল অফিস (ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক, কারেন্সি),পরিচালক গাজী মো. মাহবুবুল ইসলামকে মতিঝিল অফিস থেকে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ ও অতিরিক্ত পরিচালক মো. কামরুল ইসলামকে গভর্নর অফিস থেকে সদরঘাট অফিসে বদলি করা হয়। এই বদলি আদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের পর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও পরিবর্তনের আভাস ছিল। তবে গভর্নর পরিবর্তনের গুঞ্জন, শোকজ-বদলি, ‘মব’ কাণ্ড সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অস্থিরতা আর্থিক বাজারে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স, ব্যাংক একীভূতকরণ ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ধারাবাহিকতা জরুরি।