ঢাকা: ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, বর্তমান সরকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে কর্মসংস্থানের নতুন চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। এআই, হার্ডওয়্যার, সেমিকন্ডাক্টর, সফ্টওয়্যার, বিপিও, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা সেন্টার, স্টার্টার পয়েন্ট সেবার মাধ্যমে আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখান প্রযুক্তি শুধু ব্যবহৃত হবে না, উৎপাদন, সেবা ও রফতানি ক্ষেত্রেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে।
রোববার (১৭ মে) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) প্রধান সম্মেলন কক্ষে এ কথা বলেন তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী।
বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী টেলিকম মেলা ও সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, সবার জন্য দ্রুত ইন্টারনেট, আন্তর্জাতিক মানের সংযোগ অবকাঠামো, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, বিনিয়োগবান্ধব নীতি এবং তরুণদের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান এসব বিষয় আজকের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
মন্ত্রী বলেন, আজকের প্রতিপাদ্য কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিষয় নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থার কথা বলে যেখানে ডিজিটাল অবকাঠামো, অর্থনীতি, জনসেবা, নিরাপত্তা, পরিবহন, আর্থিক লেনদেন, দুর্যোগ সতর্কতা ও সামাজিক যোগাযোগের জীবন রেখা। আজকের পৃথিবীতে ডিজিটাল সংঘ শুধু যোগাযোগের সুবিধা নয়, এটি একটি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক লেনদেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নাগরিক জীবনের ভিত্তি।

টেলিকম মেলা ও সেমিনারে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ। ছবি: সারাবাংলা
তিনি বলেন, আইসিইউর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালে প্রায় ৬ বিলিয়ন মানুষ অনলাইনে এসেছে। এখনো ২.২ বিলিয়ন মানুষ অফলাইনে রয়েছে। অর্থাৎ সংযোগ বিস্তৃত হলেও দক্ষতা, গুণগত মান ও অন্তর্ভুক্তি এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিখাতকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের নতুন চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইশতেহারে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি, সবার জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, সফ্টওয়্যার অ্যান্ড হার্ডওয়্যার শিল্পের বিকাশ, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা, এআই চালিত ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, স্টার্ট-আপ উদ্ভাবন তহবিল, প্রযুক্তিভিত্তিক ক্যাশ লাইট অর্থনীতি গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
মাহবুব আনাম বলেন, আমরা চাই মেইড ইন বাংলাদেশ, অ্যাসেম্বল ইন বাংলাদেশ-এ ধারণা কেবল স্লোগান নয়, এটা আমাদের উৎপাদন ক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পরিচয়ের রূপরেখা।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশে মোবাইল সংযোগের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৮৪ লাখ। ইন্টারনেট গ্রাহক ১৩ কোটি ৩৬ লাখ। ফোরজি নেটওয়ার্ক দেশের ৯৯ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে গেছে। এসব অর্জন প্রমাণ করে ডিজিটাল অবকাঠামো এখন জাতীয় উন্নয়নের মূল ভিত্তি। এখন প্রয়োজন শুধু সংযোগ বাড়ানো নয়, সংযোগ নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহনশীল করা।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মতো দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ডিজিটাল অবকাঠামোর সহনশীলতা, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনকল্যাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আমাদের টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল ব্যবস্থা এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে কোনো সংকট ও দুর্যোগের সময়ও সেবা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে না পড়ে।
তথ্য মন্ত্রী আরও বলেন, গ্রাম, চর, উপকূল, পাহাড়ি অঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকার জনগণ দ্রুত, নির্ভরযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরাপদ ডিজিটাল সেবার সমান সুযোগ পায়, আমাদেরকে তা নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল উন্নয়ন তখনই সফল হবে যখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, আর্থিক সেবা, ব্যাবসাবাণিজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার প্রতিটি স্তরে পৌঁছে যাবে। আমাদের আরও গুরুত্ব দিতে হবে সাইবার নিরাপত্তা, নাগরিক তথ্য সুরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার, গবেষণা ও উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, তরুণ প্রজন্মের প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসূচির ওপর।
মন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন গত নির্বাচনি ইশতেহারে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এবং আমরা যারা এমপি হয়ে এসেছি তারা অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। সেই প্রতিশ্রুতি মোতাবেক প্রায় তিন মাসের মধ্যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, খাল খনন, ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করে দিয়েছেন। রেল স্টেশন, বিমানবন্দরে ওয়াইফাই ফ্রি করে দিয়েছি। আজকে ঢাকা বিমানবন্দরে ওয়াইফাই ফ্রি করে দেব।

ছবি: সারাবাংলা
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মিজ বিলকিস জাহান রিমি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) রেহান আসিফ আসাদ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব কাজী আনোয়ার হোসেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.)।
দিবসটি উপলক্ষ্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিটিআরসি প্রাঙ্গণে ১৭ ও ১৮ মে দুই দিনব্যাপী টেলিকম মেলার আয়োজন করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষ্যে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) মহাসচিব ডোরিন বোগডান-মার্টিন বলেন, ডিজিটাল সংযোগ এখন শুধু প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়, বরং মানবিক সহনশীলতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।