Tuesday 06 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

কেন ‘যুদ্ধে’ জড়িয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান?

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৩৬
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনা এখন ‘খোলা যুদ্ধে’ রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের বিমান বাহিনী আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ বেশ কিছু শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে। দুই দেশের সীমান্ত সংঘাত চরম আকার ধারণ করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

একদিকে পাকিস্তান দাবি করছে তারা কাবুলের উপকণ্ঠে তালিবান ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তালিবানরা ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তানের সামরিক চৌকিগুলো দখলের। রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতের মাঝেই প্রশ্ন উঠেছে ঠিক কেন এই যুদ্ধ? দীর্ঘস্থায়ী সীমান্ত বিরোধ নাকি নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠী?

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ঘোষণা করেন, আফগান তালিবান কর্তৃপক্ষের প্রতি ইসলামাবাদের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে এবং দুই দেশ এখন ‘খোলা যুদ্ধে’ লিপ্ত।

বিজ্ঞাপন

এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে তালিবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছিলেন, আফগানিস্তান ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের আক্রমণাত্মক অভিযান চালাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে তালিবান ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে।

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানান, কাবুল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাক্তিয়া এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় কান্দাহারে আফগান তালিবান প্রতিরক্ষা লক্ষ্যবস্তু আঘাত করা হয়েছে। জাবিউল্লাহ মুজাহিদও এই তিন প্রদেশে হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, পাকিস্তানের হামলায় আফগানিস্তানের দুটি ব্রিগেড ঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পিটিভি দাবি করেছে, তারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কান্দাহারে তালিবান ব্রিগেড সদর দফতর, একটি গোলাবারুদ ডিপো এবং ওয়ালি খান, শাওয়াল, বাজাউর ও আঙ্গুর আড্ডা সেক্টরে অবস্থিত তালিবান পোস্টগুলো ধ্বংস করেছে।

শুক্রবার সকালে তোর্খাম সীমান্ত ক্রসিংয়ের কাছে গোলাগুলি ও ভারী শেলের শব্দ শোনা গেছে। যুদ্ধ সত্ত্বেও পাকিস্তান থেকে আফগান নাগরিকদের ফেরত যাওয়ার জন্য এই ক্রসিংটি খোলা রাখা হয়েছে।

হতাহতের পরস্পরবিরোধী দাবি

পাকিস্তানের সামরিক অভিযানে তালিবান শাসনের ২৭৪ জন সদস্য ও ‘খারিজি’ (জঙ্গি) নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে আরও চার শতাধিক। একই সঙ্গে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী আফগান বাহিনীর ৭৩টি চৌকি ধ্বংস করেছে এবং ১৮টি দখল করে নিয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী আফগান বাহিনীর ১১৫টি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান (এপিসি) এবং কামান ধ্বংস করা হয়েছে

তালিবান সরকার এই সংখ্যা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তাদের মাত্র ৮ জন যোদ্ধা নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছে।

অন্যদিকে, আফগানিস্তান দাবি করেছে, তাদের পালটা হামলায় ৫৫ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছে এবং তারা পাকিস্তানের ২টি সামরিক ঘাঁটি ও ১৯টি পোস্ট দখল করেছে। পাকিস্তান এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে।

সংঘাতের কারণ কী

ডুরান্ড লাইন বিতর্ক: দুই দেশের মধ্যবর্তী ২,৬১১ কিলোমিটার (১,৬২২ মাইল) দীর্ঘ এই সীমান্তটি ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত। আফগানিস্তান এই সীমানাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে না। তাদের দাবি, এটি একটি ঔপনিবেশিক সীমানা যা পশতুন নৃগোষ্ঠীর এলাকাগুলোকে অন্যায়ভাবে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে।

ঘন ঘন সীমান্ত সংঘর্ষ: ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই প্রতিবেশী দেশ প্রায়ই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। দক্ষিণ ও মধ্য এশীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক সামি ওমারির মতে, ২০২১ সালে ন্যাটো ও মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে অন্তত ৭৫ বার সরাসরি সংঘর্ষ হয়েছে।

টিটিপি ইস্যু: পাকিস্তান চায় আফগান তালেবানরা যেন তাদের ভূখণ্ডে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে, বিশেষ করে ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’কে নিয়ন্ত্রণ করে। পাকিস্তানের দাবি, আফগানিস্তান এই গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে। যদিও টিটিপি আফগান তালেবান থেকে আলাদা, কিন্তু দুই দলের মধ্যে গভীর আদর্শিক ও ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে।

সন্ত্রাসবাদের প্রভাব: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে টিটিপি এবং বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি এর সশস্ত্র হামলা অনেক বেড়ে গেছে। আফগান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে এই সহিংসতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থান: পাকিস্তানের সাবেক অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইল বলেছেন, আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের কোনো ক্ষোভ নেই। তবে তিনি মনে করেন, তালেবানরাই পাকিস্তানকে এই যুদ্ধে বাধ্য করেছে। তিনি আশা করেন, নিরীহ মানুষের জানমালের স্বার্থে তালেবানরা হামলা ও সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করবে।

আফগানিস্তানের সীমাবদ্ধতা: বিশ্লেষকদের মতে, আফগান তালেবানরা সম্ভবত টিটিপি-র বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেবে না। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এক সময়কার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ওপর হামলা করলে তারা আবার তালেবানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ‘আইএস-কে’ তে যোগ দিতে পারে।

কৌশলগত পরিবর্তন: বিশ্লেষক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড মনে করেন, পাকিস্তানের এবারের হামলাগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রাসী এবং এটি তাদের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন নির্দেশ করছে। পাকিস্তানে বড় ধরনের কিছু সন্ত্রাসী হামলার পর এই উত্তেজনা বাড়াটা প্রত্যাশিতই ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আফগানিস্তানের কোনো শক্তিশালী বিমান বাহিনী নেই, তাই পাকিস্তান আকাশপথে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তবে তালিবান তাদের ‘সুইসাইড বোম্বার’ এবং ‘কামিকাজে ড্রোন’ ব্যবহার করে অপ্রথাগত কায়দায় পালটা আঘাত হানতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এটি পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা। তিনি আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানান।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরান আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়া অবিলম্বে সীমান্ত হামলা বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে প্রয়োজনে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে।

সারাবাংলা/এইচআই
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর