যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ এখন কেবল সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর। যুদ্ধের শুরুর দিকে তেল, গ্যাস এবং সারের দাম বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ থাকলেও, বর্তমানে ওষুধ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর (যেমন: কনডম) অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নতুন সংকট তৈরি করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) আল-জাজিরার প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
ওষুধের দামে রেকর্ড উল্লম্ফন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে।
যুক্তরাজ্য: ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ ‘প্যারাসিটামল’র দাম বেড়ে চার গুণেরও বেশি হয়েছে।
ভারত: ভারতেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সাধারণ ব্যথানাশকের দাম প্রায় ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং কাঁচামালের সংকটে এই দাম আরও ৩০-৪০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের প্রধান কারণ দুটি; জ্বালানি সংকট এবং লজিস্টিক বিপর্যয়।
হরমুজ প্রণালী অবরোধ: বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে ইরান এই পথটি বন্ধ করে দেওয়ায় পেট্রোকেমিক্যাল ফিডস্টকের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, যা ওষুধ তৈরির প্রধান কাঁচামাল।
বিমান পরিবহন সংকট: প্রায় ৩৫ শতাংশ ওষুধ এবং ৯০ শতাংশ জীবনরক্ষাকারী ভ্যাকসিন আকাশপথে পরিবহন করা হয়। দুবাই, আবুধাবি বা দোহার মতো বড় ট্রানজিট হাবগুলো যুদ্ধের কবলে পড়ায় এবং বিমান জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহণ খরচ ও সময় দুই-ই বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার আল জাজিরাকে জানান, এই সংকটের প্রভাব সব দেশে সমান নয়।
ভারত: ওষুধ উৎপাদনে শীর্ষে থাকলেও ভারত পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তারা বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র: এদের নিজস্ব মজুদ ও বিকল্প ব্যবস্থা থাকায় আপাতত বড় সংকটে না পড়লেও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো ইতিমধ্যে সতর্কবার্তা জারি করেছে।
গ্লোবাল সাউথ: সবচেয়ে বিপর্যয়ে আছে সাব-সাহারান আফ্রিকা, সুদান, ইয়েমেন এবং ফিলিস্তিনের মতো দেশগুলো। আর্থিক সক্ষমতা কম এবং ওষুধের মজুদ না থাকায় এসব দেশে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লজিস্টিক বিশেষজ্ঞ উটার ডিউলফ সতর্ক করে বলেছেন, ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা এখনই পুরোপুরি ভেঙে না পড়লেও আকাশপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে জেনেরিক ওষুধের দাম আরও বাড়বে। লেবানন, ফিলিস্তিন এবং ইরান সরাসরি যুদ্ধের কবলে থাকায় সেখানে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ।