ভারতের মণিপুর রাজ্যের পাহাড়ি জেলাগুলোয় নতুন করে কুকি ও নাগা গোষ্ঠীর মধ্যে সহিংসতায় নয়জন নিহত হয়েছেন। ১২ ঘণ্টার সংঘর্ষে ১৪টি বাড়ি অনেকগুলো দোকানপাট আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
দ্য টেলিগ্রাফের খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ও শনিবার (১০ অক্টোবর) রাজ্যের কামজং, উখরুল ও কাংপোকপিতে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।
শুক্রবার রাতে কামজং জেলার চাসাদ গ্রামে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে কথিত গোলাগুলির ঘটনায় কুকি নারী ডমখোনেই তোথাং নিহত হলে সহিংসতার সূত্রপাত হয়। ডমখোনেই তোথাং পাঁচ সন্তানের জননী ছিলেন। উল্লেখ্য, কামজং জেলায় মূলত নাগা জনগোষ্ঠীর বসবাস হলেও চাসাদ গ্রামটি কুকি-অধ্যুষিত।
পুলিশের ভাষ্য, চাসাদ গ্রামে অবৈধ বাংকার উচ্ছেদ করতে মণিপুর পুলিশ, ইন্ডিয়া রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন (আইআরবি) ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যরা যৌথ অভিযান চালান। এ সময় স্থানীয় নারীরা অভিযান ব্যাহত করার চেষ্টা করেন। তখন অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। জবাবে পাল্টা গুলি চালায় নিরাপত্তা বাহিনী।
সেদিন রাতেই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা কয়েকটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে সশস্ত্র গোষ্ঠী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে আবারও গোলাগুলি হয়। নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের ১৪টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের জেরে কুকি ও নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়, যা শনিবার সকাল পর্যন্ত চলে। সংঘর্ষের সময় ৪২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হন। আরও সহিংসতা রোধ করতে কর্তৃপক্ষ ওই গ্রামে ‘ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা’ (বিএনএসএস)-এর ১৬২ ধারার অধীনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার কাংপোকপি জেলায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যখন সন্দেহভাজন জঙ্গিরা তপন এবং মাকুই গ্রামে আক্রমণ করে। এম দাইমাই ও আর গ্যাংমেই নামে দুই নাগা গ্রাম রক্ষক, এবং রিংকাংমাই নামে অন্য আরেকজনকে হত্যা করা হয়।
জয়েন্ট ট্রাইব কাউন্সিল (জেটিসি) মণিপুরের ওয়ার্কিং কমিটি এবং একটি নাগা নাগরিক সমাজের সংগঠন দাবি করেছে, জঙ্গিরা ৫২ বছর বয়সি এক গ্রামবাসী আজিনবউ আর-এর শিরশ্ছেদ করেছে। সংগঠনটি মর্যাদাপূর্ণ দাফনের জন্য তার কাটা মাথা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, অন্য একটি হামলায়, সন্দেহভাজন জঙ্গিরা কামজং জেলার ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের কাছে একটি তাংখুল নাগা বসতি নিংচৌ গ্রামে প্রবেশ করে এবং গুলি চালায়। এতে গ্রামের দুই বাসিন্দা নাগাচানসো নিংশেন (৩৫) এবং লেইশিশান লেইশাদাং (৪৮) নিহত হন।
গোলাগুলির ঘটনার পর নিরাপত্তা বাহিনী গ্রামে পৌঁছালে স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, হামলাকারীরা মিয়ানমারের দিকে পালিয়ে গেছে।
উখরুল জেলায় শনিবার সন্দেহভাজন জঙ্গিদের গুলিতে ৪০ বছর বয়সী সন্দীপ রাই নিহত হন। চেপু ইয়াওলেন গ্রামের কাছে গাড়ি চালানোর সময় তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাড়ির ভেতরেই তার মৃত্যু হয়।
এছাড়া কাংপোকপি জেলার মাকুই আশাং ও তাপন এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলির খবর পাওয়া গেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষে ৪০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং বহু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, মণিপুর ইম্ফল উপত্যকায় বসবাসরত মেইতেই সম্প্রদায় এবং মূলত সংলগ্ন পাহাড়ি জেলাগুলোতে বসবাসকারী কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যকার ব্যাপক জাতিগত সংঘাতের পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। সেই সংঘাতে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, ৪৯ জন নিখোঁজ হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।