Tuesday 27 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মিশিগানে সিনেট প্রার্থী এল-সাইয়েদকে ঘিরে উত্তাল মার্কিন রাজনীতি

এইচ. এম. আকতার, নিউইয়র্ক থেকে
২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৫৫ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১২:১০

এল-সাইয়েদের নির্বাচনি প্রচারণায় সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসন নীতির পাশাপাশি এবার নির্বাচনি বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে বর্ণবাদ, ইসলামবিদ্বেষ এবং মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক অধিকার।

বিশেষ করে মিশিগানের মার্কিন সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদকে ঘিরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এল-সাইয়েদকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ করে ট্রাম্প তার দেশপ্রেম ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি তিনি।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, যদি এল সাইয়েদ জিতেন তাহলে তিনি হবেন প্রথম মার্কিন মুসলিম সিনেট সদস্য।

আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে মিশিগানের সিনেট আসনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এল-সাইয়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে এল-সাইয়েদ সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাটি জাতীয় রাজনীতিতেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এখন বড়ো প্রশ্ন—মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আক্রমণ রিপাবলিকানদের জন্য সুবিধা তৈরি করবে, নাকি তা উলটো ভোটারদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে।

 

ট্রাম্পের বক্তব্যে নতুন?
রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবর মিশিগানে এক নির্বাচনি সমাবেশে ট্রাম্প এল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং তার সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তোলেন। এমনকি ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গ টেনে তাকে ঘিরে নিরাপত্তা ও আনুগত্যের প্রশ্নও তোলেন। এল-সাইয়েদ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তার দেশপ্রেম নিয়ে এভাবে প্রশ্ন তোলা লজ্জাজনক।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। সমালোচকদের মতে, কোনো প্রার্থীর নীতি, কর্মসূচি ও রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা ভিন্ন বিষয়। বিশেষত, অভিযোগের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ না থাকলে এ ধরনের বক্তব্য নির্বাচনি প্রচারণায় বিদ্বেষ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে।

এল-সাইয়েদ মিশিগানের সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তার নির্বাচনি কর্মসূচিতে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, ধনীদের ওপর কর বৃদ্ধি এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের মতো বিষয় রয়েছে। তার এসব অবস্থান নিয়েও রিপাবলিকান শিবিরের তীব্র আপত্তি রয়েছে। ফলে নির্বাচনি লড়াইটি শুধু ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্কে সীমাবদ্ধ নয়; অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও সরকারের ভূমিকা নিয়েও দুই প্রার্থীর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

 

জরিপে এগিয়ে এল-সাইয়েদ
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলো ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর জন্য আশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরছে। রিয়েলক্লিয়ারপলিটিকসের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যে, ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ অক্টোবরের বিভিন্ন জরিপের গড়ে এল-সাইয়েদ পেয়েছেন ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ সমর্থন; রজার্সের সমর্থন ৪৬ শতাংশ। অর্থাৎ এল-সাইয়েদ এগিয়ে রয়েছেন ১ দশমিক ৯ শতাংশ পয়েন্টে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপেও এল-সাইয়েদের এগিয়ে থাকার চিত্র দেখা গেছে। মারিস্ট ইউনিভার্সিটির ১৫ থেকে ১৮ অক্টোবর পরিচালিত জরিপে এল-সাইয়েদের সমর্থন ৫০ শতাংশ এবং রজার্সের ৪৮ শতাংশ। ২১ ও ২২ অক্টোবরের ইনসাইডারঅ্যাডভান্টেজ জরিপে ব্যবধান ছিল এক শতাংশ পয়েন্ট। অন্যদিকে, সেপ্টেম্বরের শুরুর একটি জরিপে রজার্স এগিয়ে ছিলেন। অর্থাৎ এল-সাইয়েদ সাম্প্রতিক অধিকাংশ উল্লেখযোগ্য জরিপে এগিয়ে রয়েছেন।

তাছাড়া জরিপের ব্যবধান খুব বেশি নয়। নমুনা নির্বাচন, ভোটার উপস্থিতি, শেষ মুহূর্তের প্রচারণা এবং অনির্ধারিত ভোটারদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন এল-সাইয়েদ।

 

ইলহান ওমরকে ঘিরেও বিতর্ক
মুসলিম আমেরিকান রাজনীতিকদের নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য নতুন নয়। মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমরও দীর্ঘদিন ধরে তার রাজনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। অভিবাসন, ইসলাম, জাতীয় পরিচয় ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। এল-সাইয়েদকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতকে আবার সামনে এনেছে।

সমালোচকদের আশঙ্কা, মুসলিম রাজনীতিকদের বারবার নিরাপত্তা বা দেশপ্রেমের প্রশ্নে অভিযুক্ত করা হলে তাদের নীতি ও রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা আড়ালে পড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের সমর্থকদের একটি অংশ এসব বক্তব্যকে জাতীয় নিরাপত্তা ও আদর্শগত বিরোধের অংশ হিসেবে দেখেন। ফলে বিতর্কটি শুধু দুই প্রার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; যুক্তরাষ্ট্রে ধর্মীয় স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

 

বর্ণবাদী রাজনীতি কি ভোটে প্রভাব ফেলবে?
মিশিগানে আরব-আমেরিকান ও মুসলিম ভোটারদের উপস্থিতি নির্বাচনি হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ২০২৪ সালের নির্বাচনে গাজা যুদ্ধ ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অসন্তোষ এই অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। এবারও মধ্যপ্রাচ্যনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মুসলিম আমেরিকানদের প্রতি রাজনৈতিক আচরণ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২৪ অক্টোবর ডেট্রয়েটে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে প্রচারণা চালানোর সময় এল-সাইয়েদকে কম আমেরিকান হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টার সমালোচনা করেন। অন্যদিকে, সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের মতো প্রগতিশীল নেতারা অভিযোগ করেছেন, রিপাবলিকানরা অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ব্যয় সংকটের মতো বিষয় থেকে মনোযোগ সরাতে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ব্যবহার করছেন।

তবে বর্ণবাদী বা ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যের কারণে রিপাবলিকানরা নিশ্চিতভাবে ভোট হারাবেন কি না তা বলা যায় না। তবে একটা অংশ মুসলিম ভোটা, যা হারাতে পারেন রিপাবলিকানরা। মুসলিম, আরব-আমেরিকান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়লে তা ডেমোক্র্যাটদের জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে।

 

সামনে কঠিন পরীক্ষা
৩ নভেম্বরের নির্বাচন তাই শুধু মিশিগানের একটি সিনেট আসনের লড়াই নয়; এটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল, ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনি সম্ভাবনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বহুত্ববাদী সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এল-সাইয়েদ শেষ পর্যন্ত জয়ী হবেন কি না, তা নির্ভর করবে ভোটারদের উপস্থিতি, অর্থনৈতিক উদ্বেগ, প্রার্থীদের কর্মসূচি এবং শেষ মুহূর্তের প্রচারণার ওপর।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ধর্মীয় পরিচয় ও দেশপ্রেমকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্ক মিশিগানের নির্বাচনি লড়াইকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, ভোটাররা এই নির্বাচনে অর্থনীতি ও নীতিগত প্রশ্নকে বেশি গুরুত্ব দেন, নাকি পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রচারণা তাদের সিদ্ধান্তে বড়ো ভূমিকা রাখে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর