যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আজ নির্ধারিত হতে যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভবিষ্যৎ সমীকরণ। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ-কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে বড় ধরনের ক্ষমতার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাহী ক্ষমতা তার হাতে থাকলেও আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন, সরকারি ব্যয় এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কংগ্রেসের সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর তদন্ত ও নজরদারি বাড়াতে পারবেন। এমনকি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখেও ফেলতে পারবেন।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারালে বিচারক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে প্রেসিডেন্টের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ অনুমোদন আরও কঠিন হবে। একই সঙ্গে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাধা বাড়বে এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান শিবিরেও নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেই প্রেসিডেন্টের পদ বা নির্বাহী ক্ষমতা সরাসরি হারাবেন না ট্রাম্প। বরং তাঁকে আগামী দুই বছর বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করে দেশ পরিচালনা করতে হবে। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যার লড়াই নয়, বরং ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং তাঁর প্রশাসনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচির জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্নিপরীক্ষা।
জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে রিপাবলিকান পার্টি। একই সঙ্গে প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের বিজয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ৪৩৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন ২১৮টি আসন। বিভিন্ন জরিপের পূর্বাভাসে ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা ২৩৭ পর্যন্ত পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা করছে রিপাবলিকান শিবির।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই পরিবর্তন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি করেছে। নির্বাচনে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা সামনে রেখে কংগ্রেসে বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে আগামী দুই বছর কীভাবে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে, তা নিয়েও দলটির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য পরিস্থিতি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন। বিশেষ করে নির্বাচনের আগের এক মাসে যারা নিজেদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছেন, তাদের মধ্যে রিপাবলিকানদের প্রতি সমর্থন ৯ পয়েন্ট বেশি বলে জরিপে উঠে এসেছে। ফলে শেষ মুহূর্তের ভোটের সমীকরণ নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটদের জন্য ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে ডেমোক্র্যাটিক দলের স্টেট আইনপ্রণেতা জেমস টালারিকো রিপাবলিকান প্রার্থী ও স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের চেয়ে সাত পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন। সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে টালারিকোর সমর্থন ৫০ শতাংশ, অন্যদিকে প্যাক্সটনের পক্ষে রয়েছে ৪৩ শতাংশ। জরিপে অন্তর্ভুক্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্যাক্সটনের ভাবমর্যাদা সবচেয়ে নেতিবাচক বলে উঠে এসেছে। যা তার নির্বাচনী সম্ভাবনাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
মেইন অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলের সর্বশেষ রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স এবার পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটিক দলের সাবেক স্টেট সিনেটর ট্রয় জ্যাকসনের মুখোমুখি হয়েছেন। জরিপ অনুযায়ী, সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে জ্যাকসনের সমর্থন ৫১ শতাংশ, যেখানে কলিন্সের সমর্থন ৪৫ শতাংশ। মেইনের নির্বাচনী ইতিহাস ডেমোক্র্যাটদের জন্য অতটা স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ, ছয় বছর আগে নির্বাচনের আগে প্রকাশিত প্রায় সব জনমত জরিপেই সুসান কলিন্সকে পিছিয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হন। ফলে এবারও জরিপের ফলাফলকে চূড়ান্ত নির্বাচনী পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
মেইন ছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থীদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থীদের প্রতি ভোটারদের ইতিবাচক মনোভাব বেশি বলে জরিপে উঠে এসেছে। বিশেষ করে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ভাবমর্যাদা নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যার লড়াই নয়, বরং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি ভোটারদের আস্থারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ যদি ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়, তাহলে প্রতিনিধি পরিষদের পাশাপাশি সিনেটেও ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। আর তেমনটি হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আগামী দুই বছর কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে।
এদিক যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল সাইয়েদ নির্বাচনের আগের দিনও জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন। তবে শেষ মুহূর্তে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে এল সাইয়েদের কাছে পরাজিত সাবেক কংগ্রেসওম্যান হ্যালি স্টিভেন্স ১ নভেম্বর রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন। এ ঘটনায় মিশিগান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে।
গত ২ নভেম্বর ইস্টার্ন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনী সমাবেশে এল সাইয়েদ সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর সঙ্গে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন। এল সাইয়েদের প্রচারণা শিবির জানিয়েছে, স্টিভেন্সের সমর্থন প্রত্যাহারের পর একদিনেই তাঁর নির্বাচনী তহবিলে ২৪ লাখ ডলার এসেছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত কয়েকটি জরিপে এল সাইয়েদ ৪৯ থেকে ৫১ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান মাইক রজার্সের সমর্থন ৪২ থেকে ৪৫ শতাংশের মধ্যে। তবে স্টিভেন্সের আকস্মিক অবস্থান পরিবর্তন ডেমোক্র্যাটদের ভোটের ঐক্যে প্রভাব ফেলবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
মিশিগানে ইতোমধ্যে ২৩ লাখের বেশি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন। ফলে মঙ্গলবারের চূড়ান্ত ভোটের ফল নির্ধারণে অবশিষ্ট ভোটারদের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।=