ঢাকা: জামিন জালিয়াতি করে হাইকোর্ট থেকে বেরিয়ে গেছে কুকি চিনের পোশাক বানানোর প্রধান আসামি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সাহেদুল ইসলাম। এই চাঞ্চল্যকর জামিন জালিয়াতির ঘটনায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী।
সাত মাস আগে উচ্চ আদালতে তথ্য গোপন ও জামিন জালিয়াতির ঘটনা ঘটলেও তা প্রকাশ পেয়েছে চলতি সপ্তাহে। মামলার আরেক আসামি উচ্চ আদালতে জামিন নিতে এসে ওই আসামির জামিন প্রাপ্তির উদাহরণ টেনে আনলে বিষয়টি প্রকাশ পায়।
বুধবার (৩০ এপ্রিল) বিকেলে জালিয়াতির বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনেন রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
প্রধান বিচারপতি অভিযোগ আমলে নিয়ে ঘটনা তদন্তে রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে রেজিস্ট্রার জেনারেলকে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। এরই মধ্যে তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘তথ্য গোপন ও জামিন জায়িাতির ঘটনা সত্য, তদন্ত চলছে। আপনারা দ্রুতই তদন্তের অগ্রগতি জানতে পারবেন।’
জানা যায়, তথ্য গোপন করে হাইকোর্ট জামিন নেওয়া হয়। সেই জামিন আদেশে দুই বিচারপতির সইয়ের পর তাও বদলে ফেলা হয়। পরে সেই জামিন আদেশ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করে বসানো হয় নতুন করে মামলার নাম্বার ও থানার নাম। পরে দাখিল করা হয় কারাগারে। দাখিল করা জামিন আদেশের ভিত্তিতেই কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন চট্টগ্রামে ‘কুকি-চিনের’২০ হাজার পোশাক জব্দের ঘটনায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার আসামি সাহেদুল ইসলাম। যিনি চট্টগ্রামে অবস্থিত ‘রিংভো অ্যাপারেলসের’ মালিক।
সূত্র বলছে, এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের কোনো বেঞ্চ কর্মকর্তা বা ফৌজদারি শাখার কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত কি না তারও তদন্ত হচ্ছে। তবে আইনজীবীরা বলছেন, এতবড় জালিয়াতি বেঞ্চ কর্মকর্তা বা শাখার কর্মকর্তা ছাড়া সম্ভব নয়। অতএব ঘটনার গভীরে গিয়ে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে এই জামিন জালিয়াতি চক্রকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৭ মে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় তৈরি পোশাক কারখানা রিংভো অ্যাপারেলসের গুদাম থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের‘ (কেএনএফ) এর সদস্যদের জন্য তৈরি করা ২০ হাজার ৩০০টি পোশাক জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। দায়ের করা হয় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা। মামলায় রিংভো অ্যাপারেলসের মালিক সাহেদুল ইসলাম (২৫) ছাড়াও এসব পোশাক প্রস্তুতের ক্রয়াদেশ দেওয়া গোলাম আজম (৪১) ও নিয়াজ হায়দারকেও (৩৯) আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, দুই কোটি টাকা দিয়ে মংহলাসিন মারমা এবং কুকি-চীনের সদস্যদের কাছ থেকে গত মার্চ মাসে এসব পোশাক তৈরির অর্ডার নেওয়া হয়। রিংভো অ্যাপারেলসের প্রডাকশন ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামানকে এসব পোশাক জব্দের সাক্ষী রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার আসামি সাহেদুল ইসলাম কারাগার থেকে জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন। বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি আব্দুল্লাহ ইউসুফ সুমনের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চে গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর জামিন আবেদনটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসে। ওইদিনের অনলাইন কার্যতালিকা ঘেটে দেখা যায় চট্টগ্রামে জেলার ‘সাহেদুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র’ নামে দুটি মামলা আসে।
এর মধ্যে ১৩০ নম্বর আইটেমের (মামলা) টেন্ডার নাম্বার ছিলো ৭৫৯৯১। ১৩২ নম্বর আইটেমের টেন্ডার নাম্বার ছিলো ৭৫৯৯৩। দুটি টেন্ডার নাম্বার মামলা কার্যতালিকায় এসেছে ‘সাহেদুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র’ নামে। তবে ১৩১ নম্বর আইটেমের মামলার টেন্ডার নাম্বার ৭৫৯৯৩ ছিলো। এই আইটেমটি এসেছে ‘সৈয়দ মিয়া বনাম রাষ্ট্র’ নামে। ১৩১ ও ১৩২ নাম্বার আইটেমের মামলার টেন্ডার নাম্বার হবুহু এক। এখানেই মূল জালিয়াতির ঘটনা সংঘটন হয়েছে বলে জানা গেছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় জানিয়েছে, সাহেদুল ইসলাম নামের যে আসামিকে উচ্চ আদালত জামিন দিয়েছে সেটার এজাহার ছিলো পুরোপুরি ভিন্ন। সেখানে কুকি চিনের নামে ২০ হাজার পোশাক জব্দের কোন অভিযোগ ছিল না। যার কারণে উচ্চ আদালত আসামি সাহেদুল ইসলামকে জামিন দেন। সেই জামিন আদেশে দুই বিচারপতি সই করেন। দুই বিচারপতির সইয়ের পর সেই জামিন আদেশের প্রথম পৃষ্ঠায় মামলার এজাহার ও থানার নাম্বার এবং অভিযোগের ধারা বদলে ফেলে বসানো হয় কুকি চিনের নামে ২০ হাজার পোশাক জব্দের মামলার নাম্বার ও অভিযোগের ধারাসূমহ। এটাও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজন করা সেই জামিন আদেশ কারাগারে দাখিল করে মুক্ত করে নেওয়া হয় আসামি সাহেদুলকে।
জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মামলার অপর আসামি হাইকোর্টের আরেকটি দ্বৈত বেঞ্চে জামিন চান। সেই জামিন শুনানিতে মামলার মুখ্য আসামি সাহেদুল ইসলামের জামিন মঞ্জুরের বিষয়টি তুলে ধরেন আইনজীবী। পরে খোঁজ নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় দেখে, তথ্য গোপন ও জাল জালিয়াতির মাধ্যমে সাদেুলের জামিন হাসিল করা হয়েছে। এর পরই বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।