Tuesday 20 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পোল্ট্রি নীতিমালার খসড়ায় আমদানি নিষেধাজ্ঞা, শঙ্কা-উদ্বেগ খামারি-ভোক্তাদের

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২০ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৪৪ | আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৪৮

পোলট্রি

ঢাকা: পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৬ এর চূড়ান্ত খসড়ায় বাণিজ্যিক পোল্ট্রি পালনের জন্য একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খাত সংশ্লিষ্টরা। নীতিমালাটি বাস্তবায়িত হলে দেশে ৬০ হাজার কোটি টাকার শিল্পে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হবে এবং মুরগির একদিনের বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা স্বার্থও ক্ষতিতে পড়বে।

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন খামারি-ভোক্তারা।

চূড়ান্ত খসড়ার নীতিমালা ৫.৮.১.২ অনুযায়ী, বাণিজ্যিক পোল্ট্রি পালনের জন্য একদিন বয়সী বাচ্চা আমদানি করা যাবে না। কেবলমাত্র একদিন বয়সী গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক এবং বাচ্চার সংকট দেখা দিলে ক্ষেত্রবিশেষে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করা যাবে। দেশে বাণিজ্যিক খামারের জন্য একদিন বয়সী বাচ্চা আমদানির অনুমতি থাকবে না।

বিজ্ঞাপন

তবে সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমানোই এ নীতিমালার প্রধান লক্ষ্য। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বাস্তবে দেশে একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন এখনো সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো একটিতে বার্ড ফ্লু বা বড় ধরনের রোগ সংক্রমণ দেখা দিলে উৎপাদন কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় বাচ্চা সরবরাহ ব্যাহত হলে ব্রয়লার ও লেয়ার উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পোল্ট্রি সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, দেশে প্রতিদিন শুধু ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হয় ২০ লাখ। এসব বাচ্চা কোম্পানিগুলো উৎপাদন করে। একেকটি মুরগির বাচ্চা উৎপাদনে খরচ হয় ২৮ থেকে ৩০ টাকা। কিন্তু অনেক সময় ২০ টাকার বাচ্চা ৪৮ থেকে ৫০ টাকায় কিনতে হয় খামারিদের। ব্রয়লার মুরগির বাচ্চার অস্বাভাবিক দামের কারণ প্রান্তিক খামারিরা ক্ষতি পোষাতে না পেরে খামার বন্ধ করে উৎপাদন থেকে ছিটকে পড়েছেন। এ সুযোগে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পোলট্রির ফিড বা খাবার ও মুরগির বাচ্চার দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রান্তিক খামারি উৎপাদনে গেলে তখন বাজারে দাম কমিয়ে দিয়ে ক্ষতিতে ফেলছেন। পোলট্রি ফিড ও মুরগির বাচ্চা শতভাগ উৎপাদন করে করপোরেট প্রতিষ্ঠান। তারাই আবার আংশিক ডিম ও মুরগি উৎপাদন করে। চুক্তিভিত্তিক খামারও রয়েছে তাদের। এতে করে বাজার তাদের দখলে চলে যাচ্ছে। এটা বন্ধ করা না গেলে এই খাতের অস্থিরতা কমানো সম্ভব নয়।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি বাচ্চা আমদানির পথ খোলা থাকে তাহলে সংকটকালে কয়েকটি কোম্পানি তাদের একচেটিয়া ব্যবসা করতে পারবে না। এ ছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে গ্রান্ড প্যারেন্ট স্টক আমদানি করতেও অনুমতি পেতে ৬ থেকে ৮ মাস সময় লাগতে পারে, যা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বলছে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও বিকল্প উৎপাদন সক্ষমতা নিশ্চিত না করে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে দেশে ডিম ও মুরগির মাংসের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যা সরাসরি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ডিম ও মুরগির মাংস দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস। বাচ্চা সংকট তৈরি হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে।

এতে ডিম ও মুরগির মাংসের দাম বেড়ে গেলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রোটিন গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। জরুরি প্রয়োজনে বাচ্চা বা প্যারেন্ট স্টক আমদানির প্রয়োজন হলেও তা দীর্ঘ ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে করতে হয়।

ফলে আকস্মিক সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে আমদানির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখা কার্যকরভাবে সম্ভব হয় না। একদিন বয়সী বাচ্চা আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা হলে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

পোল্ট্রি প্রোডাকশন এন্ড সাপ্লাই চেইন স্পেশালিষ্ট কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, এই নীতিমালাটি বাস্তবায়ন হলে ত্রিমুখী একটা সংকট তৈরি হবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখিন হবেন প্রান্তিক খামারি ও ভোক্তারা। এই নীতিমালা বাস্তবায়নের আগে একটা গণশুনানি করতে হবে। সব স্টেকহোল্ডাররা এতে অংশগ্রহণ করে তাদের মত দিবেন। তারপর বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এটি অনুমোদন দেয়া উচিত।

উদ্যোক্তারা বলছেন, নীতিমালা প্রণয়নের আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে আয়োজিত একাধিক বৈঠকে তারা একদিন বয়সী বাচ্চা আমদানি বন্ধ না করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। সে সময় অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার ওপর জোর দিলেও চূড়ান্ত খসড়ায় নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত যুক্ত হওয়ায় তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৬ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশীয় পোল্ট্রি শিল্পকে আরও সংগঠিত ও শক্তিশালী করা হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনিম্যাল প্রোডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমদানি বন্ধ হয়ে যায় দেখতে হবে যে আমাদের সংকটকালে সমস্যা তৈরি হয় কিনা, এর জন্য বিকল্প কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমদানির বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব অংশীজনের যেন ইতিবাচক মত থাকে সেটা অবশ্যই দেখতে হবে। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর কাঠামো নিশ্চিত না করা হলে নীতির লক্ষ্য অর্জনের বদলে পোল্ট্রি শিল্প, খামারি ও ভোক্তা সবাই চাপের মুখে পড়তে পারেন।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসাইন চৌধুরী বলেন, পোল্ট্রি শিল্প কেবল একটি ব্যবসায়িক খাত নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক না কেন তা যেন প্রান্তিক খামারির পক্ষে যায় সেটা আগে ভাবতে হবে। খামারিরা যেন সঠিক সময়ে ন্যায্য দামে বাচ্চা পান সেটা আগে নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে প্রানীসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক (উৎপাদন) এবিএম খালেদুজ্জামান বলেন, সামগ্রিক পোল্ট্রি খাতের উন্নয়ন যেন হয় সেই আলোকেই নীতিমালাটির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে দেশের পোল্ট্রি খাত আরও সমৃদ্ধ হবে বলেই মনে করি।

সারাবাংলা/এমএইচ/এইচআই
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর