ঢাকা: প্রতীক বরাদ্দের পর বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছে গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার।
আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রার্থীরা তাদের প্রচার চালাতে পারবেন। তবে এবারের নির্বাচনি প্রচারের ক্ষেত্রে ড্রোন ও পোস্টার নিষিদ্ধসহ বেশ কিছু কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি)।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে কঠোর শাস্তি
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আচরণবিধি লঙ্ঘিত হলে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতা রাখা হয়েছে। এছাড়া, অপরাধের ধরণ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং প্রার্থী বা দলের জন্য দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
নির্বাচনি প্রচারে যা করা যাবে না (প্রধান নির্দেশনাবলি):
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে জারি করা গেজেট অনুযায়ী, প্রার্থীদের নিম্নলিখিত বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে:
- পোস্টার ও ড্রোন নিষিদ্ধ: ভোটের প্রচারে কোনো ধরনের কাগজের পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারের সময় ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় কোনো যন্ত্র ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- বিলবোর্ডের সীমাবদ্ধতা: একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন (দৈর্ঘ্য ১৬ ফুট, প্রস্থ ৯ ফুট)। ডিজিটাল বিলবোর্ড ছাড়া অন্য কোথাও আলোকসজ্জা করা যাবে না।
- বিদেশে প্রচার নিষিদ্ধ: কোনো দল বা প্রার্থী দেশের বাইরে কোনো জনসভা বা প্রচার কার্যক্রম চালাতে পারবেন না।
- এআই (AI) ও সোশ্যাল মিডিয়া: নির্বাচনি প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে কারো চেহারা বিকৃত করা, গুজব ছড়ানো বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইডি ও ই-মেইল রিটার্নিং কর্মকর্তাকে আগে জানাতে হবে।
- পরিবেশ সুরক্ষা: ব্যানার বা ফেস্টুনে পলিথিন বা প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারের সময় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলের মধ্যে রাখতে হবে।
- ভিভিআইপিদের সীমাবদ্ধতা: সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নামতে পারবেন না।
- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচার : কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট, বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনি প্রচার পরিচালনা করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট বা দল বা প্রার্থী সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্যাদি উক্তরূপে প্রচার শুরুর পূর্বে রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করতে হবে।
আচরণবিধিতে আরও যা রয়েছে
- প্রচার কাজে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করা যাবে না।
- ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারো চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচনসংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ সব প্রকার ক্ষতিকর কনটেন্ট বানানো ও প্রচার করা যাবে না।
- প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না; নির্বাচনি স্বার্থ হাসিল করবার জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনসংক্রান্ত সব কনটেন্ট শেয়ার ও প্রকাশ করার পূর্বে সত্যতা যাচাই করতে হবে।
- রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য কিংবা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন কিংবা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে, সাধারণভাবে বা সম্পাদন (Edit) করে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা Artificial Intelligence (AI) দ্বারা কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোনো আধেয় (content) তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করতে পারবেন না।
- গুজব ও এআই অপব্যবহার বন্ধে নির্বাচনি অপরাধ বিবেচনায় শাস্তির বিধান রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এবার নতুন ধারা যুক্ত করা হয়।
- আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে প্রার্থী ও দলের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামাও দিতে হবে।
আচরণবিধির ‘গুরুতর’ অপরাধের ক্ষেত্রে আরপিওতে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রয়েছে। আগে আচরণবিধিতে আরপিও অনুচ্ছেদটি ছিল না, এবার যুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচনি অপরাধে আরপিও ৯১ ধারা অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিল করে থাকে ইসি। এ বিষয়টি আচরণ বিধিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে।
গণমাধ্যমের সংলাপ ও সব প্রার্থীর এক মঞ্চে ইশতেহার ঘোষণার সুযোগ রাখা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট আসনে সব প্রার্থীকে নিয়ে একদিনে তাদের ইশতেহার বা ঘোষণাপত্রগুলো পাঠ করার ব্যবস্থা করবেন।
এক মঞ্চে ইশতেহার ঘোষণা
এবারের নির্বাচনে একটি নতুনত্ব যোগ করেছে কমিশন। রিটার্নিং কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট আসনের সব প্রার্থীকে নিয়ে একদিনে এক মঞ্চে ইশতেহার বা ঘোষণাপত্র পাঠ করার ব্যবস্থা করবেন। একে প্রার্থীদের ‘মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ’ হিসেবে দেখছে ইসি।
এদিকে, এই বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন বারবারই বলেছেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহযোগিতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আচরণবিধি সঠিকভাবে পালন করা হলে নির্বাচন সুন্দর হবে।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য জেসমিন টুলী জানান, এবার নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী থাকায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা এবং আচরণবিধির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন শুরুর মুহূর্ত থেকে শেষ পর্যন্ত আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করাই কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। আচরণবিধি শুধু কাগজে থাকলে হবে না, রাজনৈতিক দলগুলোকে তা বাস্তবে মেনে চলতে হবে।