ঢাকা: পদ্মা থেকে পানি অপসারণ করে সেচের মাধ্যমে আবাদি জমিতে পানি সরবরাহ ও অন্যান্য নদীর প্রবাহ নিশ্চিতে আসছে ‘পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প’। বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারেজ নির্মিত হলে রাজশাহী, পাবনা ও খুলনা বিভাগের জেলাগুলোতে কৃষি বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলাসহ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও মৎস্য খাতেও বিপুল পরিমাণ সম্ভাবনা আশা করা হচ্ছে।
প্রায় ছয় দশক ধরে আলোচনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর অনুমোদনের জন্য রোববার (২৫ জানুয়ারি) জাতীয় অর্থনৈতিক পর্ষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) উঠছে প্রকল্পটি। এটি পাস হলে আসছে মার্চ থেকেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পদ্মা বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। তবে কাজ শুরুর পর এ ব্যয় বাড়তে পারে। প্রকল্পটি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হবে। ব্যারেজ নির্মাণের ব্যয় জোগান আসবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে। তবে পরবর্তী সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাজ থেকে ঋণ নেওয়া হতে পারে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে ভারত পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করে। এতে এক তরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয় ভারত। ফলে বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে প্রবাহ ব্যাপকভাবে কমে যায়। এতে কৃষি, নৌ চলাচল, মৎস্য ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পদ্মা নদীতে এই ব্যারেজ নির্মিত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ এবং পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে পানি প্রবাহ ঠিক রাখা এবং সেচের মাধ্যমে কৃষিতে ব্যাপক উন্নতি সম্ভব হবে। প্রকল্পের হাইড্রো প্ল্যান্ট থেকে প্রায় বিনা ব্যয়ে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। ব্যারাজের ওপর দিয়ে দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি রেলওয়ে সেতুও নির্মিত হবে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, পদ্মা ব্যারাজের জন্য ডেডিকেটেড একটি ল্যাব নির্মাণ করা হবে। যেখানে নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাই করা হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় সহায়তা করবে। ২০৩৩ সালে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়ন হলে রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল, বাগেরহাট ও খুলনা জেলার কৃষিতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। প্রায় প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া হবে। নদীর পানি সারাবছর আটকে ছোট ছোট নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত করা হবে। সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি প্রত্যেক জেলায় বণ্টন করা হবে। ফলে কৃষক নাম মাত্র টাকায় চাষাবাদ করতে পারবে। গাছপালা বাড়বে, নদীতে মৎস আহরণ বৃদ্ধি পাবে। সেইসঙ্গে রুপপুর প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ পানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টকে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজের মাধ্যমে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, পানি বিভাজন এবং নিম্ন প্রবাহে পানির সুষ্ঠু বণ্টন তুলনামূলক সহজ হবে। এই প্রকল্পের প্রধান কাজের মধ্যে রয়েছে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, যার প্রতিটির প্রস্থ ১৮ মিটার। এ ছাড়া ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট থাকবে। নৌযান চলাচলের জন্য ১৪ মিটার প্রশস্ত একটি নেভিগেশন লক এবং দু’টি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিশ পাস রাখা হবে। ব্যারাজের ওপর দিয়ে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেলওয়ে সেতুও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়াও থাকবে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট।
পদ্মা নদীর পানি ভারত এক তরফাভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমে নদীতে প্রবল স্রোতের কারণে দেখা দেয় ভাঙন। আর শুস্ক মৌসুমে একেবারে শুকিয়ে খা খা করে পদ্মা নদী। ফলে প্রতিবছর কৃষিকাজ, গবাদি পশু, মৎস্যখাতসহ সবকিছুর ব্যাপক ক্ষতি হয়। বহুল আলোচিত এবং জন আকাঙ্ক্ষিত এই ব্যারাজ নির্মিত হলে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ হবে। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব হবে।