Tuesday 14 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বাঙালির আত্মপরিচয় পুনর্জাগরণের দিন আজ

সারাবাংলা ডেস্ক
১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:০০ | আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪৭

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: ইরান ও ইসরায়েল-আমেরিকার যুদ্ধে অস্থির গোটা মধ্যপ্রাচ্য। অস্থির সময় যেন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে পুরো বিশ্বকে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক টানাপোড়েনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে সারা পৃথিবীতে। আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলছে জীবন। এর মধ্যেই এসেছে বাঙালির প্রাণের উৎসব—পহেলা বৈশাখ। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন আজ। এই দিনটি বাঙালি মেতেছে প্রাণে প্রাণে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও নতুন শক্তি ও উদ্যোম এবং বাঙালি সংস্কৃতির চেতনা নিয়ে ফিরে এসে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে বাঙালির আত্মপরিচয়কে। হাজারো দুঃখ-কষ্ট ভুলে, হতাশা-গ্লানি মুছে আজ নবরূপে আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত সবাই।

মঙ্গলবার (১ বৈশাখ) সূর্যোদয়ের সঙ্গে শুরু হয়েছে নতুন বঙ্গাব্দের যাত্রা। এটি কেবল বছর পরিবর্তনের দিন নয়, এই দিনটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আত্মপরিচয় পুনর্জাগরণের দিন। হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও সংস্কৃতির বহমান ধারাকে ধারণ করে নববর্ষ আজ সর্বজনীন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। তাই ঢাকা থেকে শুরু করে সারা দেশে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে দিনটি। উত্সবের আমেজে বাঙালি আজ রঙিন পোশাক, পান্তা-ইলিশ, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে দিনটিকে বরণ করে নিচ্ছে। ফলে দিনভর মুখর হয়ে থাকবে এই জনপদসহ বাংলা ভাষাভাষী প্রতিটি অঞ্চল।

বিজ্ঞাপন

আগে পহেলা বৈশাখে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেত হালখাতার উত্সব হিসেবে। এদিন ব্যাবসায়িক হিসাব-নিকাশের নতুন সূচনা হতো। গ্রামবাংলায় মিষ্টিমুখ, নিমন্ত্রণ ও নতুন খাতা খোলার মাধ্যমে সম্পর্ক নবায়নের এক সামাজিক বন্ধন গড়ে উঠত। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রথার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। তবু দেশের হাট-বাজারে এখনো হালখাতার আয়োজন চোখে পড়ে।

দিনটি উপলক্ষ্যে পৃথক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসী ও বিশ্বের সব বাংলাভাষী মানুষকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে দেশবাসী ও প্রবাসীদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি পহেলা বৈশাখকে ঐক্য, সমপ্রীতি ও অসামপ্রদায়িক চেতনার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে কৃষি উন্নয়ন ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। নতুন বছরে ভেদাভেদ ভুলে সংযম, দায়িত্বশীলতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি উন্নত, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষ্যে দেশবাসীসহ বিশ্বের সব বাংলাভাষীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পহেলা বৈশাখকে জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেনন, “কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে নববর্ষের গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি কৃষি অর্থনীতিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।” নতুন বছরের মাধ্যমে শান্তি, সম্প্রীতি ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি সবার জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করেছেন।

প্রতিবছর ন্যায় নববর্ষ উদযাপনে ভোরের আলো ফোটার আগেই মানুষের ঢল নামে রাজধানীর রমনা উদ্যানে। সূর্যের প্রথম আলোয় শুরু হয় ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও প্রায় দুই শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে সুর, বাণী ও ছন্দের এক অপূর্ব সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। এবারের অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে স্মরণ হবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরী এবং পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের গীতিকার-সুরকার মতলুব আলীকে।

এদিন সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদের উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ, রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি ও দোয়েল চত্বর ঘুরে পুনরায় চারুকলায় ফিরে এসে শেষ হবে। এ বছর শোভাযাত্রার স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ’নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’। এবারের শোভাযাত্রায় স্থান পেয়েছে পাঁচটি প্রধান মোটিফ— মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। লোকজ প্রতীকের ধারায় এগুলো যথাক্রমে নতুন দিন, শক্তি, সৃজনশীলতা, শান্তি, গৌরব ও গতিময়তার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সেইসঙ্গে ৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর পরিবেশনায় জাতীয় সংগীত, ‘এসো হে বৈশাখ’ এবং বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান শোভাযাত্রাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে। প্রায় দুইশ শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকা বহন করে শোভাযাত্রায় অংশ নেবে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিও বঙ্গাব্দ উপলক্ষ্যে ১৩ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত টানা পাঁচদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে। ১৪ এপ্রিল মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নাট্যশালায় বিকেল ৩টায়, যেখানে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, শতকণ্ঠে ‘এসো হে বৈশাখ’ পরিবেশনা, কবিগান, গম্ভীরা ও বাউল গানের আসর বসবে। পরবর্তী দিনগুলোতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনা, অ্যাক্রোব্যাটিক প্রদর্শনী, ‘জাতি বৈচিত্র্যে বৈশাখী উত্সব’ এবং পুতুলনাট্য মঞ্চস্থ হবে। সমাপনী দিনে নৃত্য, লোকসংগীত, ব্যান্ডসংগীত ও তারকা শিল্পীদের পরিবেশনার পাশাপাশি প্রদর্শিত হবে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘বেদের মেয়ে জোসনা’।

এ ছাড়া, ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ’। এদিন ভোর ৫টা ৩০ মিনিট থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পীরা অংশ নেবেন। সেইসঙ্গে সেখানে বসেছে বৈশাখী মেলা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের জেলা-উপজেলায় বৈশাখী মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকজ উত্সবের আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজন বাঙালির ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উল্লেখ্য, বাংলা নববর্ষের ইতিহাস দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। পরবর্তী সময়ে এটি ‘ফসলি সন’ থেকে ‘বঙ্গাব্দে’ রূপান্তরিত হয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। কালের পরিক্রমায় পহেলা বৈশাখ শুধু অর্থনৈতিক বা কৃষিভিত্তিক উত্সব হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাকিস্তান আমলে এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে ইউনেসকো এই শোভাযাত্রাকে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলক। এই স্বীকৃতি শুধু উত্সবকে নয়; বরং বাঙালির সংগ্রাম, চেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐক্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে।