সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে: সিঙ্গাপুরে ভালো আছেন বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকরা। ভালো থাকার জন্য যেসব কারণ দরকার, তার সবই সিঙ্গাপুরে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানে থাকা প্রবাসীরা। তবে সিঙ্গাপুরে যেতে অনেক কাঠখর পোড়াতে হয়। এমনকি ওয়ার্ক পারমিটের হারও অনেক কম। আবার দেশটিতে অবৈধ হিসেবে থাকারও কোনো প্রকার সুযোগ নেই। সরকার আরও বেশি উদ্যোগ নিলে শ্রমিক যাওয়ার হার বাড়তে পারে বলে মত সিঙ্গাপুরে থাকা বাংলাদেশিদের।
জানা যায়, সিঙ্গাপুরে এই মুহূর্তে ওয়েল্ডিং, প্লাম্বার, নির্মাণ, ডকইয়ার্ড, রাস্তা মেরামতসহ বেশ কিছু ফ্যাক্টরিতে কাজের ভিসা দিচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন শপিং সেন্টার, দোকানে কাজের ভিসাও চালু রয়েছে। এর বাইরে অনেকে বেশি টাকা খরচ করে স্পেশাল ক্যাটাগড়িতে ভিসা নিয়ে থাকেন। আবার অনেকে বিনিয়োগ করে বিজনেস ভিসাতেও দেশটিতে বসবাস করছেন। তবে সবচেয়ে বেশি ভিসা রয়েছে নির্মাণ শ্রমিকদের।
সিঙ্গাপুরের লিটিল ইন্ডিয়া এলাকায় বাংলাদেশি এক খাবারের দোকানে কথা হয় পঞ্চগড় থেকে আসা শ্রমিক আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। সারাবাংলার এই প্রতিবেদকে তিনি বলেন, ‘আট লাখ টাকা খরচ করে দুই বছর আগে সিঙ্গাপুর আসছি। প্রতি মাসে কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা ইনকাম করি, যা দেশে পাঠাই। আবার নির্দিষ্ট কোম্পানি বাদ দিয়ে যদি ভ্রাম্যমাণ হিসেবে প্রতিদিন কাজ করি, তাহলে ইনকাম আরও বেশি। মাসে কমপক্ষে তিন লাখ টাকা ইনকাম করা যায়। এতে ঝুঁকিও আছে। কোনো কোনো দিন আবার কাজ পাওয়া যায় না। সেজন্য সিঙ্গাপুর আসার আগে সৌদি আরবে ছিলাম। সেখানে কষ্ট অনেক, আবার টাকাও অনেক কম। কিন্তু সিঙ্গাপুরে এসে পরিবারের সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছি। পাঁচ বছর পর বাড়িতে যাব বলে আশা করছি।’
আমিনুলের মতো নরসিংদীর মোস্তফা মল্লিকও সিঙ্গাপুরে আছেন অনেকদিন। দেশটির চায়না টাউন মার্কেটে কথা হয় তার সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘এর আগে আট বছর এখানে থেকে দেশে গিয়েছিলাম। দেশে দুই বছর থেকে ফের আসলাম। দেশে ব্যবসা বা অন্য কিছু নাই। অনেক চেষ্টা করেও না পেরে সিঙ্গাপুরে চলে আসলাম। শ্রমিকদের জন্য সিঙ্গাপুর অন্য দেশের চেয়ে অনেক বেশি ভালো। এখানে আয়ও ভালো। ইউরোপের মতো জীবন-যাপনও করা যায়। তবে এখানকার ভিসা এখন অনেক কঠিন। এখানে অবৈধ হিসেবে থাকার ন্যূনতম সুযোগও নেই। সঠিক নিয়মেও ভিসা হচ্ছে না। নতুনদের জন্য সিঙ্গাপুর আসা অনেক কঠিন। তবে সরকার চেষ্টা করলে ভিসা ও শ্রম নিয়ে বেশ কিছু সফলতা আসতে পারে।’
সিঙ্গাপুরে ট্রাভেল ব্যবসা করেন জাহাঙ্গীর আলম খান। সেখানকার ‘খান ট্রাভেলস’র মালিক তিনি। সিঙ্গাপুর থেকে মালয়েশিয়াগামী বাস ও প্লেনের টিকিট কেটে দেন তিনি। এ ছাড়া গ্রুপভিত্তিক ভ্রমণের জন্য গাইড দিয়ে থাকেন। এর বাইরে সিঙ্গাপুর থেকে বিভিন্ন দেশের ভিসা ও টিকিটও করে থাকেন তিনি। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের পাঁচটি দেশের মধ্যে একটি সিঙ্গাপুর। এখানকার নিরাপত্তা বিশ্বে সেরা। জীবনমানও সেরা। এখানকার পাসপোর্ট বিশ্বের এক নম্বর। এখানকার মানবিকতা এক নম্বরে, ডিসিপ্লিনও তাই। কাজেই এখানে বাস করতে পেরে অনেক খুশি। তবে এখানে বহু বছর বাস করলেও নাগরিকত্ব মেলে না। এই একটি অসুবিধা ছাড়া সবই আছে। এখানে কোনো চাঁদা দিতে হয় না। কেউ এসে দোকানে মাস্তানি করে না। পুলিশ কিংবা অন্যান্য সংস্থার সদস্যরা হয়রানিও করে না। ব্যবসায়িক পরিবেশ সিঙ্গাপুরে অনেক উন্নত।’
আরিফুল ইসলাম নামে আরেক বাঙালির সঙ্গে মেরিনা বে’তে কথা হয়। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘সিঙ্গাপুরের রাস্তাঘাট দিয়ে হাঁটলেই বোঝা যায় তারা কতটা নিয়ম মেনে চলে। আর সবকিছুই চলে অটোমেটেড। এখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক উন্নত। শিশুদের লেখাপড়া ও চিকিৎসা এখানে ফ্রি। এখানে সহজে কারও রোগব্যাধি হয় না। বাংলাদেশের অনেক ব্যক্তি এখানে চিকিৎসা নিতে আসে। শুধুমাত্র নিয়মকানুন আর নিরাপত্তার কারণে বিশ্বের বড় বড় সব কোম্পানি সিঙ্গাপুরে অফিস খুলে বসেছে।’
খান ট্রাভেলসের আরেক সহকারী মিজানুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে আসার জন্য বাঙালিদের ভিসার হার কমিয়েছে এ দেশের সরকার। আগে যেখানে শতকরা ৪০-৫০টি ভিসা হতো। এখন সেখানে ৫-১০টি ভিসা হচ্ছে। এর কোনো ব্যাখ্যা মিলছে না।’
সিঙ্গাপুর দিয়ে মালয়েশিয়া গিয়ে দেশে ফেরার সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় ভিসা রিজেক্টের হার বাড়ছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। আগে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে আসা বাংলাদেশিদের চাঙ্গি এয়ারপোর্টে তেমন কিছুই বলতো না। তবে এখন সামান্য সন্দেহ হলেই ধরে বসে।