Saturday 26 September 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

কাশবনের শুভ্রতা মলিন, যে কারণে ফুল ফুটছে দেরিতে

ফারহানা নীলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:১৩ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:২৭

কাশবন। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা : শরৎ মানেই নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা, আর নদীর চরে কাশফুলের শুভ্র মিতালী। বাঙালি সংস্কৃতি, আবেগ ও ঋতুভিত্তিক আনন্দের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শরতের কাশফুল। এই কাশফুলের উপলদ্ধির মধ্যেই বাঁজতে শুরু হয় ঢাকের বাদ্যি। জানান দেয় আসছেন দুর্গা। কারণ, উচ্ছ্বল এই ঋতুর সঙ্গেই আসে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব ‘শারদীয় দুর্গোৎসব’।

কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়– ‘সবে তো এই বর্ষা গেল শরত এলো মাত্র, এরই মধ্যে শুভ্র কাশে ভরলো তোমার গাত্র’। তবে কবির এই কবিতার মতো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকৃতিতে শরতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই দেখা মেলে না কাশফুলের। সেজন্য প্রকৃতিপ্রেমী, পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মনে এক ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শরতের দিনপঞ্জি সামনে এলেও প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে ঘটেছে ছন্দপতন। পুজোর ঢাক বেজে ওঠার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকলেও চরাঞ্চলে কিংবা উদ্যানের কাশবনে শুভ্রতার দোলা মিলছে মাত্র। যদিও এটা আগেই আসার কথা ছিল। কিন্তু এর পেছনের মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও আবহাওয়ার চরম খামখেয়ালিপনা।

বিজ্ঞাপন

স্নিগ্ধতার খোঁজে তরুণ-তরুণী ও প্রকৃতিপ্রেমীরা

ইটের খাঁচায় বন্দী ইট-কাঠের রাজধানী ঢাকায় শরতের স্নিগ্ধ ছোঁয়া পেতে অনেকেই ছুটে যান উত্তরার দিয়া বাড়ি, আফতাবনগর কিংবা কেরানীগঞ্জের চরাঞ্চলে। বিকেলের রোদ পড়তেই কাশবনের সাদা ছাতার নিচে জমাট বাঁধে দর্শনার্থীদের ভিড়। তরুণ-তরুণীদের আড্ডা, আলোকচিত্রীদের ক্যামেরার ক্লিক আর শাড়ির আঁচলে কাশফুলের আলতো ছোঁয়া। সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।

দিয়াবাড়ির কাশবনে ঘুরতে আসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তাসফিয়া নাহার প্রমি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে সারাবাংলাকে বলেন, ‘শরতের এই সময়টায় কাশফুল না দেখলে যেন ঋতুটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তবে এবার এসে দেখলাম শুভ্রতার সেই চেনা দাপট কিছুটা কম। অনেক গাছেই এখনো ফুল ফোটেনি, আবার কিছু কাশ ফুল আসার আগেই বৃষ্টিতে নুয়ে পড়েছে। তবুও শহরের ব্যস্ততা ভুলে এই কাশফুলের ছোঁয়া আমাদের মনকে এক অদ্ভুত শান্তি দেয়।’

আরেক দর্শনার্থী মাহাদী হাসান সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘শরত এলে কাশবনে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা হয় প্রতিবছরই। বলা যায়, বিয়ের পর গত ১০ বছর ধরেই এই ঋতুতে আমি পরিবার নিয়ে কোনো না কোনো কাশবনে ঘুরতে যাই। কিন্তু, ছোটবেলায় দেখতাম ভাদ্রের শুরুতেই চরজুড়ে ধবধবে সাদা কাশের দোলা। এখন আশ্বিন ঘনিয়ে এলেও কাশবনে সেই পূর্ণতা পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবুও শান্তি যে, দেখা মিলছে। যেভাবে আবাসন গড়ে উঠছে, হয়তো রাজধানীতে একটা সময় আর দেখাই পাব না কাশবনের।’

কেন শরতের এমন ছন্দপতন?

প্রকৃতির এই রূপবদলে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন পরিবেশবিদ ও জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, এটি কেবল একটি ফুলের দেরিতে ফোটার বিষয় নয়, বরং আমাদের গোটা ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যহীনতার সংকেত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বিষয়টির বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সারাবাংলাকে বলেন, ‘দেখুন, প্রকৃতি তার নিজের নিয়মেই চলে। কিন্তু, আমরা মানুষেরা সেই নিয়মে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঋতুচক্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এখন বর্ষা দীর্ঘায়িত হয়, শীত আসে দেরিতে, আর বর্ষার শেষে যে সুনির্দিষ্ট শুষ্ক আবহাওয়া ও পলিমাটি শুকানোর পরিবেশ দরকার ছিল, তা মিলছে না। কাশগাছের ফুল ফোটার জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় আলো ও আর্দ্রতার প্রয়োজন হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় সেই সিগন্যালগুলো দেরিতে পাওয়ায় গাছও দেরিতে ফুল ফোটাচ্ছে। এটি শুধু কাশফুলের নয়, সামগ্রিক উদ্ভিদকূলের জন্যই এক চরম সতর্কবার্তা।’ এ বিষয়ে বেশ কিছু জটিল প্রাকৃতিক, জৈবিক ও মানবসৃষ্ট কারণ উল্লেখ করেন তিনি। সেগুলো হলো-

দীর্ঘায়িত বর্ষা ও বিলম্বিত জলনিষ্কাশন: কাশফুল মূলত নদীর ধার, পলিমাটিযুক্ত চর বা নিচু বেলেমাটিতে জন্মায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত থাকছে। মাটি আর্দ্রতাযুক্ত ও পানিবন্দি থাকায় কাশগাছের শিকড় প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পায় না, যা গাছের প্রাকৃতিক বৃদ্ধি ও ফুল ফোটার জৈবিক সময়সূচি পিছিয়ে দেয়।

তাপমাত্রা ও ফটোপরিওডিজমের তারতম্য: উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ভাষায়, কাশগাছ হলো নির্দিষ্ট দিবালোক ও তাপমাত্রাসংবেদনশীল (Photoperiodic) উদ্ভিদ। শরৎকালের স্বাভাবিক পরিমিত রোদ ও শুষ্ক বাতাসের বদলে যদি অতিরিক্ত উত্তাপ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত চলতে থাকে, তবে গাছের ভেতরকার ফুল ফোটানোর সংকেত পাঠায় যে হরমোন, তার স্বাভাবিক নিঃসরণ ব্যাহত হয়।

অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক ঝোড়ো হাওয়া: বৃষ্টির অসময়সূচির কারণে যে ফুলগুলো কিছুটা দেরিতে ফোটে, সেগুলোও পূর্ণতা পাওয়ার আগেই আকস্মিক বাতাস ও কালবৈশাখী-সদৃশ বৃষ্টিতে ঝরে পড়ে বা কাদা-পানিতে নুয়ে নষ্ট হয়ে যায়।

নগরায়ণ ও আবাসস্থল সংকোচন: অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদীর পাড় দখল, বালু ভরাট এবং জলাশয় ধ্বংসের কারণে কাশফুলের প্রাকৃতিক রিফিউজিয়াম বা জন্মক্ষেত্রগুলো দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে।

সংস্কৃতি ও প্রকৃতির মেলবন্ধন রক্ষায় করণীয়

শুধু শরৎ-ই নয়। বাংলাদেশের ছয়টি ঋতুই , এমনভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। একেক ঋতুতে একেকটি উদ্ভিদ, ফুল ও ফলের আবির্ভাব ঘটছে না সময়মতো। বিশিষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত সারাবাংলাকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে আমাদের দেশে সনাতন ষড়ঋতুর স্বাভাবিক পরিক্রমায় স্পষ্ট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। প্রকৃতি আর আগের মতো ছকে বাঁধা ছয়টি ঋতুর চরিত্র মেনে চলছে না। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে আমাদের ফেনোলজিক্যাল সাইকেল বা উদ্ভিদের জীবনচক্রে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সঠিক সময়ে উষ্ণতা ও শুষ্কতা না পাওয়ায় কাশফুল যেমন সঠিক সময়ে ফুটছে না, তেমনি আবার অসাময়িক ঝড়-বৃষ্টি ও হঠাৎ অতিবৃষ্টির কারণে সময়ের আগেই ফুল ঝরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই ব্যাহত হচ্ছে না, বরং এই কাশবনের ওপর নির্ভরশীল ছোট ছোট কীটপ্রতঙ্গ, পাখি ও অণুজীবের খাদ্যশৃঙ্খলেও বড় ধরনের এক বিপর্যয় নেমে আসছে।’

কাশফুল শুধুই একটি বুনো ফুল নয়। এটি আমাদের কৃষ্টি, সাহিত্য এবং ঋতুভিত্তিক সংস্কৃতির এক অমূল্য ঐতিহ্য। পূজার আমেজ থেকে শুরু করে শিল্পীর ক্যানভাস সর্বত্রই কাশের স্নিগ্ধতার এক আলাদা স্থান রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি থেকে এই প্রাকৃতিক রূপকে বাঁচিয়ে রাখতে বিশেষজ্ঞরা কিছু পদক্ষেপের কথা বলছেন। সেগুলো হলো-

নদী ও চরাঞ্চল সংরক্ষণ: নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা, পলিযুক্ত চর দখল মুক্ত রাখা এবং জলাশয় ভরাট বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া।

নগর পরিকল্পনায় সবুজ বলয় রাখা: নগরায়ণের নামে ঢাকার দিয়া বাড়ি বা আশেপাশের মুক্ত প্রাকৃতিক চরাঞ্চলগুলোকে কংক্রিটের নিচে চাপা না দিয়ে সংরক্ষিত ‘প্রাকৃতিক ঐতিহ্য অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করা।

কার্বন নিঃসরণ হ্রাস ও স্থানীয় অভিযোজন: বৈশ্বিক পর্যায়ে জলবায়ু অর্থায়ন ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বেশি করে দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ ও মাটি সংরক্ষণ করা।

বিলম্বে হলেও শুভ্রতার মায়ায় মুগ্ধ প্রকৃতিপ্রেমীরা

প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা আর ঋতুচক্রের এই বিলম্ব হয়তো চেনা পঞ্জিকাকে কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে, কিন্তু শরতের চিরায়ত আবেদনকে একবিন্দুও মলিন করতে পারেনি। প্রতিকূল আবহাওয়া কাটিয়ে দেরিতে হলেও যখন চরের বুকে শুভ্রতার প্রস্ফুটন ঘটে, তখন প্রকৃতির সেই স্নিগ্ধ রূপ দেখতে ঠিকই ব্যাকুল হয়ে ওঠে মানুষের মন।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষাদময় বাস্তবতার মধ্যেও কাশবন আজ যেন এক পরম আশার প্রতীক। একটু দেরিতে এলেও, কাশফুলের দোল খাওয়া সাদা ডানাগুলো ঢাকের কাঠি আর দুর্গা পূজার আগমনী সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাতাসকে এক মায়াবী সুবাসে ভরিয়ে তোলে। মুক্ত হাওয়ায় যখন চরের নরম পলিমাটিতে সাদা কাশের মেলা বসে, তখন শহরের ব্যস্ত মানুষগুলো সব কোলাহল ভুলে সেই শুভ্রতার মাঝে খুঁজে পান এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

দেরিতে ফোটা এই কাশফুল যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের তৈরি নানা প্রতিবন্ধকতা ও জলবায়ুর আঘাত সত্ত্বেও প্রকৃতি এখনো তার সৌন্দর্য উজার করে দিতে ভালোবাসে। তবে শরতের এই চিরন্তন শুভ্র রূপ ও আনন্দের আমেজকে আগামী প্রজন্মের জন্য অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে আমাদের পরিবেশ রক্ষা ও নদী বাঁচানোর প্রতি আরও সচেতন হতে হবে বলে মনে করছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। তা না হলে, শুভ্রতার এই বিলম্বিত ছোঁয়াও হয়তো একদিন রূপকথার গল্পে পরিণত হবে।

সারাবাংলা/এফএন/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর