ঢাকা: গোধূলি পেরিয়ে রাত। অন্ধকার নামতেই রাজধানীর তেজগাঁও রেলওয়ে স্টেশন বা মাজার রোডের ফুটপাতগুলো দেখা যায় এক অন্য রূপে। দিনভর ইটপাথরের এই ব্যস্ত শহরে জীবিকার খোঁজে ঘুরে বেড়ানো কিছু মানুষ তখন ক্লান্ত পায়ে ফিরে আসেন ফুটপাতের ঠিকানায়। মাথার ওপর ছাদ নেই, চার দেয়ালের নিরাপত্তা নেই, পাশে নেই কোনো স্বজন; আছে কেবল ফুটপাতের পিচঢালা পথ, আর মাথার ওপর এক টুকরো পলিথিনের অস্থায়ী ছাদ। কারও কারও অবশ্য সেই ছাদও নেই।
তাদেরই একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব মকবুল হোসেন। কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে এক দশক আগে ঢাকায় এসেছিলেন। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের ফুটপাত এখন তার স্থায়ী ঠিকানা। দিনে রিকশা চালান, আর রাতে রিকশার হ্যান্ডেলটা কোলবালিশ বানিয়ে ফুটপাতের ওপরেই ঘুমিয়ে পড়েন। সম্প্রতি সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় মকবুল হোসেনের। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘আপা, তিন-চার হাজার টাকা বাসা ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য নাই। ওই টাকা বাঁচলে চাল-ডাল কিনতে পারি। দিন আনি, দিন খাই- এই ফুটপাতই আমার একমাত্র দুনিয়া।’
মকবুলের পাশেই ফুটপাতের এক কোণে তিন সন্তানকে নিয়ে রান্নার জোগাড় করছেন রহিমা বেগম। স্বামী মারা গেছেন বছর তিনেক আগে। গ্রামের বাড়ি ভোলায়। সর্বনাশা নদী সব গ্রাস করার পর পেটের টানে দুই মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। মানুষের বাসায় কাজ করে যা পান, তা দিয়েই চলে সংসার। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলছিলেন, ‘দিনের বেলা ফুটপাত দিয়ে মানুষ হেঁটে যায়, আমাদের গায়ে ধাক্কা লাগে। রাতের বেলা গাড়ি-ঘোড়ার শব্দ আর পুলিশের তাড়া, এ নিয়েই আমাদের জীবন।’
মকবুল কিংবা রহিমার মতো এমন হাজারো মানুষ প্রতিদিন রাজধানী ঢাকায় বেঁচে থাকার নির্মম এক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিসংখ্যানের ভাষায় এরা ‘ভাসমান জনগোষ্ঠী’, কিন্তু মানবিক দৃষ্টিতে এরা আমাদের সমাজেরই এক উপেক্ষিত ও নিঃসঙ্গ অংশ।

রাজধানীর ফুটপাতের ভাসমান জীবন। ছবি: সারাবাংলা
ভাসমান জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে রেজিস্টার্ড বা চিহ্নিত মোট ভাসমান মানুষের সংখ্যা ২২ হাজার ১৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই সংখ্যা ১৬ হাজার ৭৮৪ জন, আর নারী ৫ হাজার ৩৫১ জন। বিভাগওয়ারী হিসাবে দেখা যায়, এই জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই অর্থাৎ প্রায় ৯ হাজার ৪৩৯ জন বাস করেন কেবল ঢাকা বিভাগে।
তবে বিশেজ্ঞদের মতে, শুমারির রাতে নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে (যেমন স্টেশন, লঞ্চঘাট, মাজার) যারা উপস্থিত থাকেন কেবল তাদেরই এই গণনায় আনা সম্ভব হয়। ফলে শহরের অলিগলি, ফুটপাত বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ অস্থায়ী ঠিকানায় দিন কাটানো প্রকৃত ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা প্রাতিষ্ঠানিক এই হিসেবের চেয়ে বাস্তবে বহুগুণ বেশি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘শুধু ফুটপাত নয়, বস্তিসহ বিভিন্ন স্থানে ভাসমান মানুষ কী পরিমাণে আছে, এ বিষয়ে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম তথ্য পাই। কখনো শুনি ২০ লাখ, কখনোবা ১০ লাখ। তবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি তথ্য বা পরিসংখ্যান থাকা জরুরি। এ ছাড়া, বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ কারা; নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে; সরকারকে এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে।’
বেঁচে থাকার লড়াই ও বহুমুখী সংকট
শহরকেন্দ্রিক অপরিকল্পিত নগরায়ন, গ্রামীণ জনপদে কর্মসংস্থানের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসন (যেমন নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ) এই তিনের যাঁতাকলে পড়ে প্রতিনিয়ত রাজধানীমুখী হচ্ছেন ভাসমান মানুষরা। আর ঢাকায় এসে মুখোমুখি হচ্ছেন চরম সংকটের। মাথার ওপর ছাদ না থাকায় রোদ, বৃষ্টি ও শীতের রাতে এদের জীবন চরম বিপর্যস্ত হয়। সুপেয় পানি ও স্থায়ী শৌচাগারের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে খোলা জায়গা বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তাদের গোসলসহ অন্যান্য কাজ সারতে হচ্ছে, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাতের ঢাকায় ফুটপাতের ভাসমান মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশুরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। আইনি সুরক্ষার অভাব এবং প্রান্তিকতার কারণে তারা প্রায়শই স্থানীয় অপরাধচক্র, ছিনতাই বা নানা ধরনের শোষণের শিকার হন। পেটের দায়ে বা পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে ভাসমান পরিবারের শিশুরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকে। খুব কম বয়সেই তাদের শ্রমে জড়িয়ে পড়তে হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একই দারিদ্র্যচক্রে আটকে রাখে।
পরিসংখ্যান বলছে, স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এদের অনেকেরই ভোটার আইডি কার্ড বা জাতীয় পরিচয়পত্র থাকে না। ফলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বা ত্রাণ সহায়তার সুফল সরাসরি তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছায় না।
দেশজুড়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নানা রূপ
রাজধানী ঢাকার বাইরে পা রাখলেই দেশের অন্যান্য বড় শহর- চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট কিংবা নদীমাতৃক জনপদের রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, মাজার বা খোলা আকাশের নিচে দেখা মেলে অসংখ্য ছিন্নমূল মানুষের। তবে বর্তমান বাস্তবতায় অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। সেটি হলো- যাদের আমরা ছিন্নমূল বা প্রান্তিক বলি, তাদের সঙ্গে কি রোহিঙ্গা শরণার্থী, আটকে পড়া ‘বিহারি’ জনগোষ্ঠী কিংবা হিজরা ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও সম্পৃক্ত?
বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা দেশের সাধারণ ভাসমান জনসংখ্যার শুমারির ভেতরে অন্তর্ভুক্ত নন। তারা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ এবং নোয়াখালীর ভাসানচরের নির্দিষ্ট ক্যাম্পগুলোতে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছেন এবং তাদের জীবনযাত্রার আইনি ও কাঠামোগত ভিত্তি সম্পূর্ণ আলাদা।
অন্যদিকে, ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশে আটকে থাকা উর্দুভাষী বা ‘বিহারি’ জনগোষ্ঠী এবং সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রান্তিক ও আবাসনহীন কাঠামোর সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর কিংবা সৈয়দপুর ও খুলনার ক্যাম্পগুলোতে গাদাগাদি করে বসবাস করা এই মানুষগুলোর জীবনযাত্রা বস্তি বা ভাসমান জীবনের চেয়ে কোনো অংশে কম মানবেতর নয়।
উত্তরণের পথ ও প্রশাসনিক ভাবনা
কেবল উচ্ছেদ অভিযান বা ত্রাণ বিতরণ দিয়ে এই জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন ব্যবস্থার জন্য দেশজুড়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও উপজেলাগুলোতেও প্রকল্প রয়েছে। কোটা নীতিমালা ও লটারির মাধ্যমে বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটের মূল্য পরিশোধের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কিস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে এর সুফল পেতে পারে।’
জনসংখ্যার সঙ্গে ভূমিব্যবস্থপনার সমন্বয় নিয়ে নগর উন্নয়ন অধিদফতরের পরিচালক মো. মাহমুদ আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভূমির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে আমাদের পরিকল্পনা আরও সুদূরপ্রসারী হতে হবে। গ্রামাঞ্চল বা উপজেলা পর্যায়ে আয়বর্ধনমূলক অফিস এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো উন্নত করার মাধ্যমে যদি ঢাকামুখী জনস্রোত কমানো যায়, তবে সামগ্রিক আবাসন সংকট অনেকাংশেই সমাধান করা সম্ভব হবে।’
এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সারাবাংলাকে জানান, পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমেই সারা দেশে বাসযোগ্য ও টেকসই নগর গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। নগরায়ণ যেন অপরিকল্পিতভাবে না হয়, সেজন্য মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আবাসন, সড়ক ও প্রয়োজনীয় নাগরিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, দিনের বেলা যাদের ঘাম ঝরা পরিশ্রমে সচল থাকে এই তিলোত্তমা ঢাকা, রাতের বেলায় সেই মানুষগুলোর এক টুকরো পলিথিনের নিচের অনিশ্চিত জীবন নিয়ে পড়ে থাকে। একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনে এই প্রান্তিক ভাসমান মানুষগুলোর নিরাপদ জীবন ও টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।