ঢাকা: স্থপতিদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে চায় সরকার বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, সরকার স্থাপত্য শিক্ষাকে এবং স্থপতিদের পেশাকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদায় মূল্যায়ন করে। দেশের মেধাবী স্থপতিরা যেন বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াতে পারেন, সেজন্য যা যা সহায়তা প্রয়োজন সরকার তা করবে। আমাদের বহু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে যারা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন। সরকার চায় বর্তমান প্রজন্মের স্থপতিরাও সেই সাফল্য বয়ে আনুক।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি)’ আয়োজিত ‘বাংলাদেশ আর্চ সামিট ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাহ্দী আমিন এসব কথা বলেন।
দেশের স্থপতিরা যেন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, আমরা এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি, যখন আমাদের নবনির্বাচিত সরকারের বয়স মাত্র আট মাস। এই সময়ে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে ঠিকই, তবে আমরা প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে সমস্যা সমাধানের এক অনন্য সুযোগ হিসেবে দেখছি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার হিসেবে যেসব নীতি গ্রহণ করেছেন, তার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে দেশের সামগ্রিক স্থাপত্য ও অবকাঠামোগত দৃশ্যপটে বড় রূপান্তর আসবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, এই নতুন সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নতুন পরিচয় তুলে ধরতে স্থপতিদের তাঁদের মেধা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার চায় দেশের স্থপতিরা এমন দৃষ্টিনন্দন ও মানসম্পন্ন স্থাপত্য উপহার দিক, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি সমৃদ্ধ করবে।
মাহ্দী আমিন জোর দিয়ে বলেন, রূপান্তরের এই প্রক্রিয়ায় সরকারি খাত প্রয়োজনীয় সহায়ক নীতিমালা ও অবকাঠামোগত সুবিধা তৈরি করবে, যাতে বেসরকারি খাত সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্র পায়।দেশীয় স্থপতিদের পেশাগত দক্ষতার ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, সরকারের নিবিড় সহযোগিতার মাধ্যমে তারা দেশ ও বিশ্বমঞ্চে অনন্য সাফল্য অর্জন করবেন। এছাড়া, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এবং বাংলাদেশি স্থাপত্য ডিগ্রির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি) ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় সরকারের সর্বোচ্চ সমর্থন থাকবে।
স্থাপত্যকে জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত একটি বিশেষায়িত ও সৃষ্টিশীল পেশা হিসেবে উল্লেখ করেন মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, স্থাপত্য সময়ের সারমর্ম, ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে ধারণ করার পাশাপাশি বৈশ্বিক সেরা চর্চাসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে। বিশ্বজুড়ে স্থাপত্যের দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তিত হলেও বাংলাদেশের স্থপতিরা নিজেদের সংস্কৃতি ও শেকড়কে অক্ষুণ্ণ রেখেই অনন্য অবদান রেখে চলছেন।
প্রতি বছর দেশজুড়ে প্রায় এক হাজার নতুন গ্র্যাজুয়েট স্থপতি বের হচ্ছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে কার্যকর যোগসূত্র স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তরুণ স্থপতিদের জন্য স্থানীয় বাজারে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশে উচ্চতর মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রির পথ উন্মুক্ত করার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন উল্লেখ করেন, বর্তমানের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বাংলাদেশি স্থপতিরা দেশেই শিক্ষা ও ডিগ্রি গ্রহণ করবেন, তবে মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে দেশে বসেই বিদেশের বড় বড় নকশা ও স্থাপত্যের কাজ পরিচালনা করবেন। এই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি), বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে (বিএসি) যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। বিশেষ করে ক্যানবেরা অ্যাকর্ড-এর সাথে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাংলাদেশি ডিগ্রির বিশ্বজনীন স্বীকৃতি অর্জনের তাগিদ দেন তিনি।
স্থাপত্য শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকার সার্বিক মূল্যায়নের উদ্যোগ নেবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন, মানসম্মত লাইব্রেরি, স্টুডিও, স্থাপত্য সরঞ্জাম, উপযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এবং ইন্ডাস্ট্রির সাথে সংযোগ জোরদার করার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ ও স্থাপত্য শিক্ষার জন্য অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দে সরকার প্রস্তুত রয়েছে।
লন্ডন বা নিউইয়র্কের আইকনিক স্থাপনাগুলোর উদাহরণ টেনে মাহ্দী আমিন বলেন, বাংলাদেশি স্থপতিদেরও সেই সক্ষমতা রয়েছে যা ঢাকা ও পুরো দেশের জন্য বিশ্বমানের আইকনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে। স্থাপত্য যেন কেবল বর্তমানের প্রয়োজন না মিটিয়ে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে, সেদিকে নজর রেখে আধুনিকতার সাথে দেশীয় শেকড়, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ রাখার আহ্বান জানান তিনি।
ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশের (আইএবি) সভাপতি স্থপতি প্রফেসর ড. শরীফ শামস ইমনের সভাপতিত্বে সম্মেলনে আর উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আখতার হোসেন খান, দক্ষিণ আফ্রিকার স্থপতি কেভিন বিংহ্যাম, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এম মাহবুবুর রহমান, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ফুয়াদ হাসান মল্লিক, স্থপতি মাহমুদুল আনোয়ার রিয়াদ এবং স্থপতি প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম।