Monday 26 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আওয়ামী ভোট টানতে মরিয়া সব দল

মো. মহসিন হোসেন স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২৩:৫৯ | আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০০:০৪

আওয়ামী ভোট টানতে মরিয়া সব দল। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগকে কেউ পছন্দ না করলেও তাদের ভোটের দিকে এখন সবার নজর। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগপন্থীদের ভোট কীভাবে নিজ দলের দিকে টানা যায় সেই চেষ্টায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি-চরমোনাই-বামসহ সবদলের নেতারা। এরই মধ্যে প্রতিটি দলের প্রার্থীসহ দলীয় শীর্ষ নেতারা আওয়ামী সমর্থকদের কাছে সরাসরি অথবা গোপনে ভোট চাইছেন বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি নির্বাচনি প্রচারেও দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দলমত নির্বিশেষে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’র মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটায়। এক পর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যেতে বাধ্য হয়। সেইসঙ্গে তার দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েক হাজার নেতাকর্মীও দেশের বাইরে চলে যায়। তবে ওই সময় যারা দেশে ছিলেন তাদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন। আবার যারা বাইরে আছেন তারাও অনেকটা আত্মগোপনে আছেন।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত হয়ে আওয়ামী লীগ প্রধান ও দলের শীর্ষ নেতারা পালিয়ে গেলেও দেশে তাদের একটা বড় ভোটব্যাংক রয়েছে। সেই ভোট ব্যাংকের দিকেই এখন সবার নজর। কারণ, এই ভোট ব্যাংকটি যে দল কাজে লাগতে পারবে তারাই ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করতে পারবে।

বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীকে কেউ নির্বাচনের মাঠে নেই। যদিও তাদের দোসর জাতীয় পার্টি ও কয়েকজন স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন, কিন্তু এদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এ অবস্থায় বিএনপি জোট ও জামায়াত জোটের প্রার্থীরাই ক্ষমতায় যাওয়ার দাবিদার। এই দুই জোটের প্রার্থীরা আবার ভোটের হিসাব মিলাতে গিয়ে দেখছে, আওয়ামী ভোট ব্যাংক থেকে যে প্রার্থী যত বেশি ভোট টানতে পারবে, সেই বাজিমাত করবে।

গত ২১ জানুয়ারি নির্বাচনি প্রতীক পাওয়ার পরই প্রার্থীরা প্রচারে নেমেছেন। দুই জোটের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তারা আওয়ামী ভোট নিজেদের দিকে টানতে চাচ্ছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৩ জানুয়ারি বিকেলে তার নিজ আসন ঠাকুরগাঁও-১-এর দেবীপুর খুররমখাঁ আদর্শ কলোনি এলাকায় নির্বাচনি পথসভায় বলেন, ‘হাসিনা আপা ভারতে গিয়ে তাদের কর্মী-সমর্থকদের বিপদে ফেলে রেখে গেছেন। আমরা সেই কর্মী-সমর্থকদের পাশে আছি। যারা অন্যায় করেছে তাদের শাস্তি হবে, আর যারা অন্যায় করেনি আমরা তাদের কোনো শাস্তি হতে দেব না। একটি দল হিন্দু, মুসলমান ভাগ করতে চাইছে, কিন্তু আমরা তা কখনোই চাই না। আমরা এই দেশের সব ধর্মের মানুষের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই।’

আবার শনিবার (২৪ জানুয়ারি) বিকেলে ভোলায় দলীয় শোডাউন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও বিএনপি জোটের প্রার্থী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘গত ১৭ বছরের রুদ্ধ ও অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনীতিতে সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে।’

এছাড়া গতবছরের এপ্রিলে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা জামায়াত আয়োজিত গণসংযোগ পক্ষ উপলক্ষ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘গত ১৫ বছর ধরে আমাদের ওপর নানাভাবে জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছে। এর অবসান হয়েছে ৫ আগস্ট। ওই রাতেই আমি আমার দলের সকল সহকর্মীকে বলেছি, আল্লাহর ওয়াস্তে কেউ যেন কোনো প্রতিশোধ না নেয়। প্রতিহিংসা কখনও শান্তি আনে না।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের একটি পুরনো বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি বলেন, ‘তিনি বলেছিলেন সরকার পতন হলে পাঁচ লাখ লোক হত্যার শিকার হবে। কিন্তু বাস্তবে এমন কিছু ঘটেনি। কারণ প্রতিহিংসা নয়, আমরা শান্তিপূর্ণ পথেই আছি।’ অমুসলিমদের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আপনারা যদি কখনও জুলুমের শিকার হন, প্রতিবাদ করুন, প্রতিরোধ গড়ুন, আমাদের পাশে রাখুন। জামায়াত সংখ্যালঘুদের পাশে ছিল, আছে, থাকবে।’

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নিরপরাধ নেতাকর্মীদের হয়রানি বা গ্রেফতার করা হলে জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে থানা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী হারুনুর রশীদ। গত ৯ জানুয়ারি রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নয়াগোলা এলাকায় কল্যাণপুর যুব সংঘের আয়োজনে অনুষ্ঠিত নাইট মিনি ক্রিকেট টুর্নামেন্টে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন।

হারুনুর রশীদ বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রতীক নেই। ফলে আওয়ামী লীগের ভোটাররা কাকে ভোট দেবেন, সেটি তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তারা চাইলে জামায়াতে ইসলাম বা বিএনপিকে ভোট দিতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি আওয়ামী লীগ করেন এই অজুহাতে তাকে হয়রানি করা হয় বা ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তা মেনে নেওয়া হবে না।’

এদিকে পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনের বিএনপির প্রার্থী রুহুল আমীন দুলাল ২৪ জানুয়ারি এক পথসভায় বলেন, ‘যেসব ভালো মানুষ আওয়ামী লীগ করেছে, তাদের দায়-দায়িত্ব আমরা নেব। কোনো আওয়ামী লীগের ক্ষতি মঠবাড়িয়ায় হবে না। তাই ১২ তারিখে মা-বোনদের নিয়ে ভোট দিয়ে আমাদের জয়যুক্ত করবেন।’ রুহুল আমীন দুলালের এই বক্তব্যে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, তারা আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট টানতেই এমন বক্তব্য দিচ্ছেন।

অপরদিকে গত ২৪ জানুয়ারি হাতিয়ায় গণসংযোগের সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এসসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনে শাপলা কলি প্রতীকে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘এলাকায় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নন- এমন সব মানুষকে ১০ দলীয় জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাই। সাধারণ আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে যারা কোনো ধরনের জুলুম, নির্যাতন বা অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না, তারাও চাইলে জোটে আসতে পারেন।’

এ প্রসঙ্গে ইসলামি আরবি বিশ্বদ্যিালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামছুল আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি অরাজনৈতিক ব্যক্তি। রাজনৈতিক বক্তব্য আমার দেওয়া ঠিক না। তারপরও বলব, ভোটের জন্য হোক আর রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য হোক ফ্যাসিস্টদের কাছে টানা ঠিক হবে না। এই দেশের শত শত ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছেন। যাদের হাতে এখনো রক্তের দাগ লেগে আছে, ভোটের জন্য তাদের কাছে টেনে নেওয়া ঠিক না। এটা নৈতিকতাবিরোধী কাজ।’

সকলের বিবেক বোধ কাজে লাগিয়ে কাজ করা উচিত মন্তব্য করে শামছুল আলম বলেন, ‘রক্তের দাগ এখনো রয়ে গেছে। এ অবস্থায় ভোটের জন্য অনেকে তাদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন, তা আমরাও দেখতে পাচ্ছি। যারা ভোটের জন্য ফ্যাসিস্টদের কাছে যাচ্ছে, ওরা সুযোগ পেলে তাদেরকেও ছাড়বে না।’

বিজ্ঞাপন

আওয়ামী ভোট টানতে মরিয়া সব দল
২৬ জানুয়ারি ২০২৬ ২৩:৫৯

আরো

মো. মহসিন হোসেন - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর