ঢাকা: জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।
সোমবার (১৫ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সম্পূরক মঞ্জুরি দাবির ওপর দেওয়া ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় তিনি এসব বিষয় তুলে ধরেন।
আলোচনার শুরুতে স্পিকার তাকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় নিয়ে বক্তব্য দিতে আহ্বান জানালেও রুমিন ফারহানা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর উদ্দেশে বক্তব্য শুরু করেন। এ সময় স্পিকার তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এটি প্রশ্নোত্তর পর্ব নয়। জবাবে তিনি বলেন, সংসদে প্রশ্ন জমা দিলেও উত্তর পাওয়ার সুযোগ হয় না, আবার সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগও মেলে না। তাই মন্ত্রীকে সামনে পেয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উত্থাপন করতে চান।
পরে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও প্রশাসনসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বক্তব্য দেন।
রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলায় যেসব জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পরও সরকার গঠনের প্রায় ৪ মাস পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ পাওয়া যাচ্ছে না।
তার ভাষ্য, সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয় শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে, যা সাংবিধানিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অংশ নিতে পারবে কী-না সেই প্রসঙ্গ টেনে রুমিন ফারহানা বলেন, “কখনো আমরা শুনতে পাচ্ছি যে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে, কেউ বলছে পারবে না। কেউ বলছে দলীয় প্রতীকে হবে না বলে যারা ক্লিন ইমেজের আছেন তারা পারবেন। এই বিষয়গুলো যদি মাননীয় মন্ত্রী পরিষ্কার করতেন, আমার মনে হয় সংসদ সদস্যরা যারা আছি তাদের বুঝতে সুবিধা হতো”।
তার প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে পারি যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যে সিদ্ধান্তে আমরা একমত হয়েছি সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন হবে”।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রুমিন ফারহানা বলেন, দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ কোটি টাকা হলেও প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে এবং মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
তিনি আরও বলেন, সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২২ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শ্বেতপত্র ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে রুমিন ফারহানা দাবি করেন, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। একই সময়ে ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংক খাতকে ব্যবহার করে অযোগ্য ও অদৃশ্য ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সুদের হার ও ডলারের মূল্যও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো অর্থনীতিতে।
বাজেট বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণে জর্জরিত থাকায় সরকার ঘাটতি বাজেটের অর্থায়নে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নতুন সরকারের সঙ্গে নতুন করে চুক্তির কথা বলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ঋণের জন্য বাংলাদেশকে বিকল্প উৎসের দিকে তাকাতে হতে পারে, যেখানে সুদের হার তুলনামূলক বেশি।
সবশেষে এই তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে অর্থমন্ত্রী কী করে এই বাজেট বাস্তবায়ন করবেন এবং পরিচালন ব্যয়ের জন্য চাওয়া বিশাল অঙ্কের টাকা কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।