।। এম এ কে জিলানী, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।
ঢাকা: চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং বিবিআইন (বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান)-এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন সম্ভব। বিশ্ববাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে গালিভার টাইপের দেশগুলোকে মোকাবেলা করে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দক্ষিণ এশিয়ার লিলিপুট (অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে) রাষ্ট্রগুলোকে আঞ্চলিক সংযোগের ছাতায় আসতে হবে। প্রথমে মানসিক সংযোগ বা মানুষে মানুষে সংযোগ ঘটাতে পারলেই পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক বা অন্য সংযোগগুলো ঘটাতে সুবিধা হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিআরআই এবং বিবিআইএন এর গুরুত্ব’ শীর্ষক দুদিনব্যাপী সেমিনারের প্রথমদিনে বক্তারা এ কথা বলেন। সেমিনারটি বিআইআইএসএস এর মিলনালয়তনে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বোদ্ধারা এই সেমিনারে অংশ নেয়। প্রথমদিনে বাণিজ্যিক সংযোগ এবং পরিবহন সংযোগ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
দুদিনব্যাপী সেমিনারের প্রথমদিনের প্রথম অধিবেশনে ‘বাণিজ্যিক সংযোগ’ শীর্ষক আলোচনায় সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। তাই আঞ্চলিক সংযোগ বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সংযোগকে কাজে লাগাতে পারলে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সম্ভব। বিশেষ করে এই অঞ্চলের সঙ্গে সড়কপথের সংযোগ স্থাপন করতে পারলে অর্থনীতির চিত্র পাল্টে যাবে।
তিনি আরও বলেন, বিবিআইন বা বিআরআই এই ধরনের উদ্যোগকে অনেকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ঝুকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু দিনশেষে অর্থনৈতিক মাপকাঠিই নিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবেলা করে। এছাড়া এই সংযোগ একবার স্থাপন করতে পারলে বাণিজ্যসহ একাধিক সুবিধা পাওয়া যাবে।
নয়াদিল্লির ফোরাম ফর স্ট্র্যাটেজিক ইনিশিয়েটিভ-এর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল দিপংকর ব্যানার্জী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নে সার্ক (দক্ষিণ এশিয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সার্ক এখন মৃত। তাই এই অঞ্চলের উন্নয়নে এখন বিআরআই এবং বিবিআইএন এর প্রতি মনোযোগি হতে হবে। সবশেষ চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক বিআরআই সফলতার প্রতি ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের আরও উদার হতে হবে। কেন না মুক্তবাণিজ্য এবং উদার সমাজনীতি সফলতার চাবিকাঠি। বিবিআইএন একটি নতুন উদ্যোগ, নতুন বার্তা, নতুন সম্ভাবনার দ্বার, তাই এর শতভাগ বাস্তবায়ন করলে এই অঞ্চলের সকলেই তার উপকার ভোগ করতে পারবে।
নেপালের শিল্প-বাণিজ্য এবং বিতরণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব পুরুষোত্তম ওঝা বলেন, বিবিআইএন চুক্তি গত ৩ বছর আগে করা হয়েছে। অথচ এখনো এর বিবিআইএর প্রটোকল করা হয়নি। এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তেমন কোনো দূরত্ব নেই। কিন্তু সড়ক বা পরিবহন সংযোগের অভাবে একে অন্যের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারছে না। তাই উন্নয়নের জন্য বিবিআইএন এবং বিআরআই বাস্তবায়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রলীঙ্কার রিজিওনাল সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক গামিনী কিরাওয়ালা বলেন, বিশ্ববাণিজ্যের প্রেক্ষাপটে গালিভার টাইপের দেশগুলোকে মোকাবেলা করে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দক্ষিণ এশিয়ার লিলিপুট (অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে) রাষ্ট্রগুলোকে আঞ্চলিক সংযোগের ছাতায় আসতে হবে। আর এই জন্য সার্ককে জেগে উঠতে হবে। সার্ককে জেগে ওঠাতে হলে বিবিআইএন এবং বিআরআই বাস্তবায়নে মনোযোগি হতে হবে। কেন না একটির সঙ্গে আরেকটির নিরিড় সংযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলের উন্নয়ন তরান্বিত করতে হলে পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সরকার প্রয়োজন। তা না হলে এই অঞ্চলের শতভাগ উন্নয়ন সম্ভব হবে নয়।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জন্য বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে আঞ্চলিক সংস্থা) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার বিবিআইএনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিবিআইনের সবগুলো রাষ্ট্রের সঙ্গে একমাত্র ভারতেরই কমন সীমান্ত রয়েছে।
অধ্যাপক মাহবুবুল আলম বলেন, প্রথমে মানসিক সংযোগ বা মানুষে মানুষে সংযোগ ঘটাতে পারলেই পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিক বা অন্য সংযোগগুলো ঘটাতে সুবিধা হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক করিম বলেন, সার্ক মৃত নয়, সার্ক এখন কোমায় রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া জলবেষ্টিত অঞ্চল। জলপথের সম্ভাবনাকেও কাজে লাগাতে হবে। যার মধ্যে বঙ্গপসাগর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিবিআইএন এর মধ্যে সমুদ্র পথের যোগাযোগও অর্ন্তভূক্ত করা প্রয়োজন।
সাবেক বাণিজ্য সচিব সোহেল আহমেদ চৌধুরী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংযোগ এবং উন্নয়নের জন্য সবার আগে প্রয়োজন মানসিক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বাংলাবান্ধা এই অঞ্চলের বাণিজ্যের একটি অন্যতম হাব বা বন্দর হতে পারে। অথচ রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য তা গত এক যুগেও সম্ভব হয়নি।
ব্যবসায়ী আশরাফ ইবনে ওমর বলেন, এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক উন্নয়নে বাধা দিচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এ ছাড়া বাংলাদেশ এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কী ধরনের এবং কতো ভলিউমের বাণিজ্য করবে তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, বিআরআই এবং বিবিআইএন উদ্যোগ বাস্তবায়নে উদ্ভূত একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশগুলোর মধ্যে সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। সময়োপযোগী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে যেকোনো সংযোগ ভিত্তিক উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।
সারাবাংলা/জেআইএল/এমআই