Saturday 10 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠান
অবসায়ন প্রক্রিয়াধীন, সরকারি অনুদানে সঞ্চয়ের অর্থ ফেরত পাবেন আমানতকারীরা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:০০ | আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:২৩

৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন প্রক্রিয়াধীন। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবসায়ন (বন্ধের) প্রক্রিয়াধীন দুর্দশাগ্রস্ত ৯টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) আমানতকারীরা আইন অনুযায়ী বিমার আওতায় কোনো অর্থ ফেরত পাবেন না। কিন্তু আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার স্বার্থে সরকারি অনুদানে (বিশেষ বরাদ্দ) টাকা ফেরতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান লিকুইডেটেশন (অবসায়ন বা বন্ধ) হলে প্রথম ধাপে সরকারের তহবিলের থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা অনুদান নিয়ে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের ফেরত দেওয়া হবে। যদিও ক্ষুদ্র আমানতকারীসহ সবার টাকা ফেরত দিতে দরকার হবে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে অবশিষ্ট টাকা সরকারের পরবর্তী থোক বরাদ্দ এবং ঋণের বিপরীতের জামানতের সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

সূত্র জানায়, চূড়ান্ত বন্ধের প্রক্রিয়াধীন পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), এফএএস ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও প্রিমিয়ার লিজিং এর গ্রাহকদের সঞ্চয়ের টাকা পরিশোধে মোট লাগবে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের। বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের।

তবে বড় গ্রাহক হলেও ক্ষুদ্র গ্রাহকের সমান টাকা প্রথম ধাপে ফেরত পাবেন। আর বড় গ্রাহক এবং কর্পোরেট গ্রাহকের পুরোট টাকা বন্ধকীকৃত সম্পত্তি এবং প্রয়োজনের সরকারের বিশেষ থোক বরাদ্দ থেকে পরিশোধ করা হবে। সে জন্য লম্বা সময়ের শঙ্কা করা হচ্ছে। কিন্তু ক্ষুদ্র গ্রাহকে টাকা ফেরতের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের অনুরোধে আর্থিক খাত স্থিতশীল রাখার স্বার্থ সরকার ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। যেখানে সরকারের কোণ স্বার্থ বা মালিকানা পাওয়ার সুযোগ নেই। সে জন্য এই বরাদ্দ সরকার অনুদান হিসাবে খরচ দেখাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংক রেজ্যুলেশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ এর আওতায় সমস্যাগ্রস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডানগন কোন অর্থ ফেরত পাবেন। আবার আমানতকারীরাও বিমান আওতায় কোন অর্থ ফেরত পাবেন না। যদিও ব্যাংকের গ্রাহকেরা বিমার আওতায় ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পান। এমন পরিস্থিতেতে সরকার বিশেষ বরাদ্দ দিলে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য ভালো হবে। এমন পরিস্থিতি এড়াতে আর্থিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, অবসায়ন ক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন করে পরিচালককে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া আরও দুজন করে কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি অকার্যকর ঘোষণা করা হবে ৯ প্রতিষ্ঠানকে। তারা একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি অবসায়নের সুপারিশ করা হবে। সে জন্য সর্বোচ্চ দুই মাস লাগতে পারে। তারপর টাক ফেরত পাবেন এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকেরা। তবে এসব প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নে কেন করা হবে না তা জানাতে নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে জবাব না দিয়ে অবসায়ন করতে সম্মতি দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানগুলো।

এর আগে গত ৫ জানুয়ারি গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকের পর গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার শূন্য করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এই নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর (নন-ভায়েবল) ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থান-নেট অ্যাসেট ভ্যালু নির্ধারণ করা হবে। অডিটের ফল সামনে এলে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। এ নিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকির জন্য গঠিত ব্যাংকিং রেজুলেশন ডিভিশন কাজ করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এফএএস ফাইন্যান্সের মোট ঋণের ৯৯.৯৩ শতাংশই খেলাপি। পুঞ্জীভূত লোকসান ১ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা। ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি এবং লোকসান ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা। বিআইএফসির খেলাপি ঋণ ৯৭.৩০ শতাংশ ও লোকসান ১ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের খেলাপি ঋণ ৯৬ শতাংশ এবং লোকসান ৪ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। পিপলস লিজিংয়ের খেলাপি ঋণ ৯৫ শতাংশ ও লোকসান ৪ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। আভিভা ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ৮৩ শতাংশ ও লোকসান ৩ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। প্রাইম ফাইন্যান্সের ৭৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি ও লোকসান ৩৫১ কোটি টাকা। প্রিমিয়ার লিজিংয়ের খেলাপি ঋণ ৭৫ শতাংশ, লোকসান ৯৪১ কোটি টাকা। জিএসপি ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ৫৯ শতাংশ ও লোকসান ৩৩৯ কোটি টাকা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ৯ টি প্রতিষ্ঠানের অবসান শুধু সংখ্যা হিসাবে নয়, বরং দেশের আর্থিক খাতে জবাবদিহি ও শৃঙ্খলার নতুন অধ্যায়ের সূচনা। শেয়ার শূন্য হওয়ার অর্থ বিনিয়োগকারীদের জন্য কঠিন বাস্তবতা হলেও, দীর্ঘমেয়াদি এটি আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। আর আমানতকারীদের অর্থ সরকারি তহবিল থেকে ফেরত দেওয়ার রীতি যেন স্থায়ী রূপ দেওয়া উচিত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথমে ২০টি এনবিএফআই বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে ১১টি এনবিএফআই ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। তাতে সন্তুষ্ট হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু দুর্বল ৯ টির চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রশাসক নিয়োগ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে ৩৫টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ২০ টিকেই সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের পরিমাণ ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকাই খেলাপি (৮৩.১৬ শতাংশ)। বিপরীতে বন্ধকি সম্পদের মূল্য মাত্র ৬ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। তবে ৩৫টি এনবিএফআইয়ের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা, যা খাতটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। মোট খেলাপি প্রায় ৭৬ হাজার কোটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ৯ টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্র গ্রাহকদের টাকা ফেরতে সরকার অনুদান হিসাবে অর্থ দিচ্ছে। এখানে তো বন্ধ হয়ে গেলে সরকার কোন মালিকানা পাবে না। যদিও একীভূত ব্যাংকে অর্থ দিয়ে সরকার মালিকানা নিয়েছে। সে জন্য বলা যায়, সরকারি অনুদানেই বন্ধ হওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকেরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন। কেননা, তারা আইন অনুযায়ী কোণ টাকা ফেরত পাবেন না।

সারাবাংলা/এসএ/এসআর
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর