ঢাকা: রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মন্দ ঋণ বা কু ঋণ বাড়ছে। গত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এসব ব্যাংকের মোট মন্দ ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৪৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
ব্যাংকগুলো হচ্ছে- সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল।
গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোতে মোট খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপির হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পালাবদলের পর ব্যাংক খাতে পুনর্গঠিত, পুনঃ তফসিলকৃত, অবলোপনকৃত ও আদালতে আটকে থাকা ঋণসহ মোট ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে মন্দমানের কু ঋণ ৫ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের মোট ঋণ ৮৯ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় অযোগ্য কু ঋণ ১৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা বা ২০ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
জনতা ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি ৯৬ হাজার ৫৬৫ কোটি। ব্যাংকটির মন্দ ঋণ ৬৯ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা বা ৭২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
অগ্রণী ব্যাংকের মন্দ ঋণ ৭২ হাজার ৭৩৯ কোটি। ব্যাংকটির কু ঋণ ২৯ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৪০ দশমিক ৩১ শতাংশ।
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, আদায় জোরদারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে খেলাপি ঋণের লক্ষ্যের বড় একটি অংশ আদায় হয়েছে। আমরা খেলাপি ঋণ আদায়ে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু খেলাপিরা একের পর এক অজুহাত দেখাচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় ঋণ তফসিল ও আদালতের মাধ্যমে বকেয়া আদায়ের গতি ফিরেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রূপালী ব্যাংকের মোট ঋণ ৪৬ হাজার ৩২১ কোটি। আর এই ব্যাংকের আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণ ২১ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা বা ৪৬ দশমিক ৩২ শতাংশ।
বেসিক ব্যাংকের মোট ঋণ ১২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মন্দ ঋণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৫২ কোটি বা ৭০ দশমিক ১২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) মোট ঋণ ২ হাজার ৯০ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মন্দ ঋণ ৯৫৩ কোটি বা ৪৫ দশমিক ৬০ শতাংশ।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, বিগত সরকারের আমলে দেশের ব্যাংক খাতে রাক্ষস ভর করে বসেছিল। অনেকে ঋণ পরিশোধ না করেও নিয়মিত দেখিয়েছে। যার নেপথ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বলতা ছিল। এখন সর্বাত্মক চেষ্টা করেও তা আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এর প্রভাবে মন্দ ঋণ বেড়েছে।
অন্যদিকে নথিপত্র অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম ছয় মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী, জনতা, সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের কাছে বকেয়া অর্থের পরিমাণ ৩১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। আর ঋণ আদায়ের লক্ষ্য ছিল ২ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। সেখান থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ২১৯ কোটি। আদায়ের হার লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকের ঋণ বিতরণের নিয়মাবলি মানতে হয়। গ্রাহকের ঋণ মনিটর করতে হয়। প্রকল্প যাচাই করা জরুরি। কিন্তু বিগত সরকারের সময়ে কিছু বড় গ্রাহকেরা জামানত ছাড়াই ভুয়া তথ্য দিয়ে ঋণ নেয়। যা আদায় করা যাচ্ছে না। কিন্তু গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ন্যূনতম সঞ্চিতি রাখতে পারছে না কিছু ব্যাংক। এটা ব্যাংকের জন্য অশুভ সংকেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ইচ্ছাকৃতসহ সব খেলাপির কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কঠোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকে সঙ্গে ঋণ আদায়ে লক্ষ্যে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। আদালতে আটকা খেলাপি আদায়ে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টার কথা জানিয়েছেন গভর্নর।