খুলনা: খুলনা–৫ আসনের ১০ দলীয় জোট প্রার্থী ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, দুঃশাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের এই অন্ধকার অধ্যায় শেষ করতে হলে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকালে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নের আল আকছা, আরাফাত মহল্লা, শিবপুর, বাদুরগাছা এলাকায় গনসংযোগ ও উঠান বৈঠক করেন সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।
ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় গণসংযোগ ও পথসভায় তিনি বলেন, অর্থনীতিতে প্রকাশ্য লুটপাট, বিচার ব্যবস্থাকে দলীয় যন্ত্রে পরিণত করা, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং ভিন্ন মত দমনে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার মাধ্যমে দেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই ধ্বংসাত্মক বাস্তবতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষ আজ দশ দলের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার জন্য।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেতা জামায়াতে ইসলামীকে কুফর ও শিরকের সঙ্গে তুলনা করে যে দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অজ্ঞতাপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন, তা শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন নয়, বরং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সরাসরি অবমাননা।
তিনি বলেন, আল্লাহ, রাসুল, ফেরেশতা, পরকাল ও তাকদিরে বিশ্বাসী কোনো মুসলমানকে কুফরি বলার কোনো অধিকার কারোর নেই। হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি অন্য মুসলিমকে কাফের বলে, সেই অপবাদ তার নিজের ওপরই বর্তায়। ইসলাম সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান ও গবেষণা ছাড়াই এমন মন্তব্য একটি মুসলিম দেশের রাজনৈতিক নেতার জন্য চরম লজ্জাজনক। এই বক্তব্যে জনগণ বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পূর্বে অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী একা ছিল না। মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, পিডিপি এবং বামপন্থী কমিউনিস্ট দলসহ বহু রাজনৈতিক দল সে সময় ভারতীয় আগ্রাসনের আশঙ্কা থেকে ভিন্ন রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েছিল। ইতিহাস বিকৃত না করে এই বাস্তবতা স্বীকার করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীকালে ভারতের আধিপত্যবাদী আগ্রাসন, নিপীড়ন ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নগ্ন হস্তক্ষেপ সেই সময়কার আশঙ্কাগুলোকেই সত্য প্রমাণ করেছে। এসব বিষয় নিয়ে ঐতিহাসিক পর্যালোচনা হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে জামায়াতে ইসলামীকে মিথ্যা, অসত্য ও ভিত্তিহীন ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করা সম্পূর্ণ অন্যায়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামী কোনো হত্যা, গণহত্যা বা ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ দশক পার হলেও এসব অভিযোগের ভিত্তিতে একটি মামলা বা জিডিও হয়নি এটাই প্রমাণ করে অভিযোগগুলো রাজনৈতিকভাবে সাজানো।
তিনি অভিযোগ করেন, শেখ মুজিবুর রহমান ও শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাদের রাজনৈতিক উত্তরসূরিরা দলীয় স্বার্থে মিথ্যা ন্যারেটিভ তৈরি করে রাজনীতিকে যুক্তি, নৈতিকতা ও আদর্শশূন্য করে ফেলেছে এবং জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে এসব ভোঁতা অস্ত্র ব্যবহার করছে, যা জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে।
১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পিপিআর প্রত্যাহার করে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে বিভেদ নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একইভাবে ১৯৯১ সালে সরকার গঠনে আসন সংকটের সময় জামায়াতে ইসলামীর নিঃস্বার্থ সমর্থনেই সরকার গঠন সম্ভব হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়ে কঠোর মন্তব্য করে তিনি বলেন, কোনো বড় রাজনৈতিক নেতার যদি এই বিষয়ে উত্তর খোঁজার প্রয়োজন হয়, তাহলে তাকে ১৯৭৯ সালে তার পিতার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, পরবর্তীতে চারদলীয় জোট গঠন এবং দীর্ঘদিন জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে একত্রে আন্দোলন ও রাজনীতি করার ইতিহাসের মধ্যেই সেই জবাব খুঁজতে হবে। অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে ভূমিকা রাখা একাধিক রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানোর সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর সেখানেই নিহিত রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনীতিতে বিভেদ ও শত্রুতা উসকে দিয়ে স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টাকে জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ধরনের অপরিণামদর্শী, উসকানিমূলক ও দায়িত্বহীন বক্তব্য অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।
সেক্রেটারি জেনারেল আরও বলেন, খুলনা–৫ আসনে চাঁদাবাজ, কালো টাকার মালিক ও সন্ত্রাসীরা দল-মত নির্বিশেষে রাষ্ট্র ও সমাজকে জিম্মি করে রেখেছে। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দাড়িপাল্লায় ভোট দিয়েই জনগণকে তাদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মানবিক সমাজ কায়েম করতে হলে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- খুলনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম ও অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য এডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা, হরিণটানা থানা কর্মপরিষদ সদস্য লিখন হোসেন, মতিউর রহমান, আব্দুর রশীদ মল্লিক, শহিদুল ইসলাম, ডা. ইলিয়াস হোসেন, তাজুল ইসলাম, আমীর হোসাইন, সালাউদ্দিন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, রাসেল গাজী, রফিকুল ইসলাম, মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ, আবু মুহসীনসহ অন্যান্যরা।
পরে সেক্রেটারি জেনারেলের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে বিএনপি থেকে নাসির গাজীর নেতৃত্বে কয়েকজন জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। পরে বাদুরগাছা উঠান বৈঠক স্থানীয়দের মধ্য থেকে বক্তব্য রাখেন নাসির গাজী, কামরুল ইসলাম গাজী, সাথী আক্তার, ওবায়দুল্লাহ সোহাগসহ অন্যান্যরা।