Saturday 24 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে রাজনৈতিক দলের সংস্কার অধিক প্রয়োজন

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৩৩

-ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলের সংস্কার করা বেশি প্রয়োজন। একইসাথে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপন করতে হবে।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) “স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শাসন প্রক্রিয়া” শীর্ষক একটি নীতি সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।

শনিবার (২৪ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

সংলাপে নীতিনির্ধারক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কীভাবে একটি জনমুখী ও দুর্নীতিমুক্ত শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক মুহাম্মদ শওকত আলী হাওলাদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম জাহিদ, জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা হাবিবা, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক দিদার ভুঁইয়া, সাবেক সচিব ও বিপিএটিসি-র সাবেক রেক্টর এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুন নাহার খানম, বিএনপি-র সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী এবং সিজিএস-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং শাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা প্রায়শই সাধারণ প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালিত হয়, কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই বিষয়গুলো কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়। এগুলো সরাসরি রাজনৈতিক শক্তির ব্যবহার, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করে। প্রশ্ন শুধুমাত্র শাসন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নয়, বরং এই প্রক্রিয়া কাদের জন্য, কীভাবে, এবং কোন দায়বদ্ধতার কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা উপেক্ষা করা যায় না। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি শুধু নির্বাচনী ভাষণে সীমাবদ্ধ না হয়ে, বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

ড. সেলিম জাহান বলেন, আমি তিনটি শব্দে স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা, দায়বদ্ধতা এবং জবাবদিহিতা, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব তুলে ধরব। সরকারী কাজের দৃশ্যমানতা জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। কোনো সরকার তার কর্তৃত্ব জনগণের কাছে তুলে ধরতে পারে না। তথ্য-উপাত্ত অনেক বেশিই অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। এটি অতিরঞ্জিত করা মানে জনগণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। নির্বাচিত সরকার কোনো দলের সরকার নয়, এটি পুরো দেশের সরকার। নির্বাচিত সরকার যদি দেশের জনগণের স্বার্থের বিপক্ষে কথা বলে, তাহলে তা দূর করতে হবে। দায়বদ্ধতা আসলে আমাকে নিজেই নিশ্চিত করতে হবে। এর পেছনে নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। দায়বদ্ধতা উপরের স্তর থেকে নিশ্চিত করতে হবে। দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি চালু করতে হবে।

ড. মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, আমাদের আসলে মাঠে নেমে আসতে হবে, শুধু কথা বললেই হবে না। আমাদের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতে হবে। আমাদের যার যে দায়িত্ব থাকুক, আমাদের তা পালন করতে হবে। আর এই সরকারকে ভেতর এবং বাইরের সকল সমস্যার প্রতি আন্তরিক হতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী যে ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তার সাথে আমাদের আগামী যে সরকার আসুক না কেন, তা যেন জনগণের সরকার হয় এবং এই সরকার জনগণের সাথে নিয়ে ভেতর এবং বাইরের সকল সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে। আমি যখন এনবিআরের চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন বিগত সরকার আসার সময় ইশতেহারে লেখা ছিল যে, প্রতিটি সংসদ সদস্যের সম্পদের বিবরণ দেওয়া হবে।

ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ট্রাম্প বিশ্ব ব্যবস্থার যে জায়গায় নিয়ে গেছে, সেখানে ছোট দেশগুলিতে স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা থাকবে কি না, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। ট্রাম্প প্রশাসন কেন আমাদের দেশের একটি নির্দিষ্ট দলের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে চায়, তা নিয়ে জানতে হবে এবং তা নিয়ে প্রতিবেদন করতে হবে। দ্বৈত নাগরিকত্বের অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, আমি তা গ্রহণ করিনি। দ্বৈত নাগরিকত্ব হলে, দুই দেশের নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে।

বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, বিগত ৫৪ বছর ধরে এই বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। স্বচ্ছতা এবং শাসন প্রক্রিয়া উপরের স্তর থেকে আসতে হবে।

সুব্রত চৌধুরী বলেন, ১২ তারিখের পরে আমাদের কি আরও বিপর্যয় অপেক্ষা করছে? এত বিপর্যস্ত অবস্থায় আমরা থাকতে চাই না। এই সরকার এখন লাইফ সাপোর্টে রয়েছে। কোনো সরকার-ই কথা রাখেনি। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শাসন যদি রাজনৈতিক দলের মধ্যে না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এগুলো কিভাবে নিশ্চিত হবে? পুরো রাষ্ট্র অসুস্থ হয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলের শব্দচয়ন ঠিক রাখতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে আমাদের রাজনৈতিক দলের সংস্কার করা বেশি প্রয়োজন। তাহলেই দেশের সকল স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, এটি খুবই দুঃখজনক যে, আমরা কতটা স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা পাচ্ছি তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আমরা এখন আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে আছি, কিন্তু তারাই বলে একটি তরুণ দল থেকে অনেক সংসদ সদস্য আসবে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে স্বচ্ছতা কোথায়? গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরা কি আজও পেয়েছি? আমরা ইউজড টু হয়ে গেছি।

অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রথম অন্তরায় হলো কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট। যখন ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন শেষ পর্যন্ত গুছিয়ে চলে কারণ, যখন সে ক্ষমতায় থাকবে না, তখন তার জীবন সঠিকভাবে চলবে কি না, সেই ভয় থাকে। তাই তারা ক্ষমতায় থাকার সময় ভয় দূর করার জন্য নিজেদের জন্য আলাদা উইন্ডো খুলেন।

ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো নির্বাচনী ইশতেহার লিখেছিল আওয়ামীলীগ, কিন্তু তার পর তারা কী বাস্তবায়ন করেছেন? রাজনৈতিক দলের আচরণ এখন ভালোভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। আমরা প্রায়ই শাসন ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু কীভাবে বাস্তবায়ন করব, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকা উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিল করতে হবে।

এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, আইন ভাঙার চেয়ে, আইন না থাকাই ভালো। সরকারের পক্ষ থেকে ভোটারদের পক্ষে যাওয়া উচিত নয়। কারণ, যদি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ভোটের পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা বলেন, তবে তখন অন্তর্বর্তী সরকারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অন্তর্বর্তী সরকার অনেক চুক্তি করলেও সাধারণ মানুষ তা জানে না। আমরা যদি স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা চাই, তবে রাষ্ট্রপ্রতি থেকে শুরু করে প্রতি পদে মেধা, দক্ষতা এবং যোগ্যতার মাধ্যমে নিয়োগ দিতে হবে এবং তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

দিদার ভুঁইয়া বলেন, এই অন্তর্বর্তী সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে অনেক ঘাটতি রয়েছে, আমরা এখনও তাদের সম্পদের হিসাব পাইনি। ইউনুস সাহেব নভেম্বর মাসে বলেছিলেন যে, ডিসেম্বরের মধ্যে সব উপদেষ্টার সম্পদের হিসাব দেওয়া হবে, কিন্তু তা হয়নি। গুম-খুনের বিষয়ে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি করার কোন ব্যবস্থা নেই, এবং সরকারও এ বিষয়ে কিছুই করতে পারেনি।

অধ্যাপক ড. শামসুন নাহার খানম বলেন, রুল অফ ল, গুড গভর্নেন্স, ট্রান্সপারেন্সি – এই শব্দগুলো সুন্দর হলেও বাস্তবতা এবং তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণের মধ্যে অনেক ফাঁক রয়েছে। আমাদের সমস্যা গুলোর মূল কোথায়? আইন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নে সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। যদি আমাদের সদিচ্ছা থাকে, তবে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা সহজেই চলে আসবে। অনেক চুক্তি নন-ডিক্লোজার এ রেখে

মুহাম্মদ শওকত আলী হাওলাদার বলেন, টেকসই উন্নয়ন, ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। যারা নেতৃত্বে আছেন, তাদের সততার উপর নির্ভর করে তারা কি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবেন? রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা প্রথমে যে শক্তি নিয়ে ক্ষমতায় আসেন, পরে সেই শক্তি ও সততা কমে যায়, দায়বদ্ধতা থাকে না, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার জন্য সেই শক্তি অপব্যবহার হয়।

পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে দেখছি, নির্বাচিত সরকার সংস্কারের প্রতি আগ্রহ দেখায় না। নির্বাচিত হয়ে তারা জনগণের প্রতিশ্রুতি দ্রুত ভুলে যায়। বর্তমানে বন্দর লিজ নিয়ে তাড়াহুড়া, নির্বাচিত সরকারের দায়িত্বের ঘাটতি এবং সামরিক বিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো স্পষ্টতা নেই।

সারাবাংলা/একে/এসআর
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর