রংপুর: ‘দুই দিন ধরে এই স্ট্যান্ডে ঘুরছি, পা ব্যথায় ফুলে গেছে, চোখে ঘুম নেই। টিকিট নেই বলে কাউন্টার থেকে ফিরিয়ে দিচ্ছে, অথচ কালোবাজারে দ্বিগুণ দামে মিলছে। আমি গার্মেন্টসের কর্মী। ঢাকায় ফ্যাক্টরিতে যোগদান না করতে পারলে চাকরি চলে যাবে। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী আমি—স্বামী অসুস্থ, দুটি সন্তানের মুখে অন্ন জুটবে কী করে? ঈদের আনন্দ শেষ হলো, এখন শুধু অন্ধকার!’
বুধবার (২৫ মার্চ) রাতে বিভাগীয় নগরী রংপুরের কামারপাড়া ঢাকা কোচ স্ট্যান্ডে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফিরতে টিকিট পাওয়া নিয়ে বিড়ম্বনায় এভাবে কষ্টের কথা বলছিলেন পোষাকশ্রমিক আবেদা বেগম। আবেদা বেগমের মতো এমন হাজার হাজার যাত্রী এখন চরম অসহায়তায় পড়েছেন।
আবেদা বেগমের মতো অভিযোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান ঈশিতার; তাদের কণ্ঠে ক্ষোভ আর অসহায়তা মিশে আছে। তিনি বলেন, ‘বাস কাউন্টারগুলোতে টিকিট বিক্রির নামে চলছে সিন্ডিকেটের নির্মম নৈরাজ্য। ২৩ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত কোনো টিকিট নেই বলে ঘোষণা দিয়ে কাউন্টারগুলো শত শত টিকিট নিজেদের কাছে আটকে রেখেছে। অথচ সেই টিকিটই কালোবাজারে ২-৩ গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় বড় শহরে ফিরে যাওয়া যাত্রীদের চোখে এখন শুধু আতঙ্ক আর হতাশা।’
সূত্র জানায়, নগরীর কামারপাড়া ঢাকা কোচ স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন দুই শতাধিক এসি-ননএসি বাস ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য গন্তব্যে চলাচল করে। ঈদের ছুটি কাটিয়ে গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে আসা মানুষের ঢল নেমেছে এখানে। কিন্তু টিকিট না পেয়ে তারা এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করছেন।

বুধবার (২৫ মার্চ) রাতে স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা গেছে চরম বিশৃঙ্খলা। কাউন্টারের সামনে ভিড়, কিন্তু টিকিটের নামে শুধু ‘নেই’ শব্দটাই শোনা যাচ্ছে। যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, এবার ঈদের আগে কোনো কাউন্টারই অগ্রিম টিকিট বিক্রির ঘোষণা দেয়নি। বেশিরভাগ কোম্পানি সিন্ডিকেট করে টিকিটগুলো আগাম চক্রের হাতে তুলে দিয়েছে। ফলে সাধারণ যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
সারাবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, আগামী সোমবার (৩০ মার্চ) পর্যন্ত রংপুর-ঢাকা পথের সব বাসের টিকিট শেষ হয়ে গেছে তবে কাউন্টারে না থাকলেও চড়া দামে কালোবাজারে ঠিকই মিলছে টিকিট। এ ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি দাম নেয়া হচ্ছে। ঢাকা পর্যন্ত সাধারণ বাসের টিকিট বিআরটিএ নির্ধারিত ৮৬০ টাকা হলেও কালোবাজারে তা ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এ ছাড়া বিলাসবহুল গাড়ির ক্ষেত্রেও বাস মালিকরা ঈদ-পরবর্তী ১০ দিন ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। কাউন্টারে টিকিটের মূল্য তালিকায় দেখা যায়, পুরোনো এসি বাসের টিকিট ১০০০ টাকার জায়গায় ১৮০০ টাকা এবং ১৫০০ টাকার হুন্দাই বাসের টিকিট করা হয়েছে ২৪০০ টাকা। অত্যাধুনিক নতুন বাসের ভাড়া করা হয়েছে ৩০০০ টাকা।
চট্টগ্রামগামী যাত্রী আফসানা বেগম ও সাখাওয়াত হোসেনের মতো অনেকেই বলছেন, ‘টিকিট না পেলে চাকরিতে যোগদান অনিশ্চিত। অফিস থেকে ছুটি শেষ, এখন ফিরতে না পারলে চাকরি চলে যাবে।’
ঢাকাগামী পোষাকশ্রমিক সালেহা বেগম বলেন, ‘দুদিন ধরে ঘুরেও আশ্বাস ছাড়া কিছু মিলছে না। আমরা গরিব মানুষ, দ্বিগুণ দামেও টিকিট কিনতে পারি না। কিন্তু কাউন্টারগুলো লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।’
মানবাধিকারকর্মী মাহমুদুল হক বলেন, ‘এই নৈরাজ্য শুধু রংপুরেই নয়—এটি প্রতি ঈদের পর ফিরতি যাত্রায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বারবার দেখা যায়। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট বিক্রির কথা বলা হলেও বাস্তবে সিন্ডিকেটের দাপটে তা কার্যকর হয় না। হাজারো পোষাকশ্রমিক, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা এখন ঝুঁকিতে। একদিকে চাকরি হারানোর ভয়, অন্যদিকে পরিবারের দায়িত্ব এই দ্বন্দ্বে যাত্রীরা শুধু কাঁদছেন।’
এ বিষয়ে হানিফ, শ্যামলী, এনা, ডিপজল, অরিন, আগমনী, এসআরসহ অন্তত আরও ১০টি পরিবহনের কাউন্টার ব্যবস্থাপক জানান, ঈদের পর যাত্রীর চাপ বেশি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকা থেকে বাস এসে না পৌঁছানোর কারণে রংপুর থেকে ছেড়ে যেতেও দেরি হয়। টিকিট আগে বিক্রি হয়ে গেলে কিছু করার থাকে না।
এসব পরিবহনের বেশ কয়েকজন সুপারভাইজার জানান, প্রতি ঈদে এমনিতে যাত্রী পরিবহনে হিমশিম খেতে হয়। তবে কালোবাজারে টিকিট বিক্রির বিষয়ে সদুত্তর দিতে পারেননি কেউই।
জানা গেছে, কালোবাজারি ইস্যুতে ভুক্তভোগীরা ভোক্তা অধিকার অধিদফতরে ফোন করলেও বিষয়টি নিয়ে তদারকিতে নেই এই সংস্থাটি এমন অভিযোগ তাদের। এ বিষয়ে রংপুর জেলা ভোক্তা অধিকার অধিদফতরের কোনো কর্মকর্তা ফোনে সাড়া দেননি। অফিস থেকে জানানো হয়েছে, তারা ছুটিতে আছেন।
তাই যাত্রীরা প্রশ্ন তুলছেন—ছুটি কি তাদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়? সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই হৃদয়বিদারক ভোগান্তি প্রতি ঈদে চলতেই থাকবে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
বিআরটিএ রংপুরের সহকারী পরিচালক শফিকুল আলম সরকার জানান, নন-এসি গাড়ির টিকিটের মূল্য (রংপুর-ঢাকা) ৮৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। যাত্রী সাধারণের হয়রানি ঠেকাতে বিআরটিএ নিয়মিত তদারকি করছে, বসানো হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী জানান, অভিযোগ পেয়ে মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দুপুরে কামারপাড়ার বাসস্ট্যান্ডে অভিযান চালানো হয়। এ সময় মাহমুদ আলম নামের এক টিকিট কালোবাজারিকে হাতেনাতে ধরা হয়। হয়রানি ঠেকাতে গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করছে।
মানবাধিকারকর্মী মাহমুদুল হক বলেন, রংপুরের এই ঘটনা শুধু একটি স্ট্যান্ডের নয় এটি হাজারো স্বপ্নভঙ্গের গল্প। যারা ঈদে পরিবারের সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটিয়ে এসেছেন, আজ তারা কর্মস্থলের টানে ফিরতে গিয়ে নিজেদের অসহায়ত্বে ভেঙে পড়ছেন। প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ চাই—যাতে এই যাত্রীরা আর কষ্ট না পান। না হলে ঈদের পরের এই ‘ফেরার যাত্রা’ যেন প্রতিবারই অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।