লালমনিরহাট থেকে ফিরে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশে জ্বালানি তেল বিক্রি নিয়ে অরাজকতা শুরু করে দিয়ছ এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। সরকারের হাজার চেষ্টাতেও তাদের দমানো যাচ্ছে না। চক্রটি শহর থেকে গ্রাম-গঞ্জ সবখানে সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। তেল মজুদ করে সেই তেল উচ্চ দামে বিক্রি করছে বলে প্রতিদিন অভিযোগ করছেন সাধারণ ক্রেতারা। সরকার নির্ধারিত তেল ১২৫ টাকায় বিক্রির কথা থাকলেও সেই তেল ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আর জনগণও নিরুপায় হয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
সম্প্রতি লালমনিরহাটের বিভিন্ন উপজেলার হাট বাজার ও দোকানপাট ঘুরে তেল বিক্রির এ চিত্র দেখা গেছে।
গত ১৯ মার্চ লালমনিরহাট সদর উপজেলার পুলিশ লাইন্স মোড়ে তেল পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেলে তেল দিচ্ছেন তবে ২০০ টাকার বেশি নয়। তবে কানে কানে বললেন, রাত ১ টার পর আসতে। ওই সময় আসলে ১৫০ টাকা লিটারে ৫ লিটার তেল পাওয়া যাবে। অপারেটরের কথা অনুযায়ী ওই মোটরসাইকেল চালক রাত ১টার কিছু পর গিয়ে দেখেন মোটরসাইকেলসহ অন্যকোনো গাড়ি নেই। তবে ভ্যান আছে অনেকগুলো। সেই ভ্যানগুলোতে ড্রামে তেল ভরানো হচ্ছে। অকটেন ও পেট্টোল ১৫০ টাকা লিটার আর ডিজেল ১১০ টাকা লিটার দরে। তিনি ৫ লিটার তেল পাওয়ায় বেশি কিছু বলেননি।
২০ মার্চ রাত ১২টা। কালিগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার তেলের পাম্পে দেখা যায়, শত শত ড্রামে তেল ভরা হচ্ছে। অথচ মোটরসাইকেলে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকার তেল। এর দুই ঘণ্টা পর ওই পাম্পে আরেকজন তেল নিতে গিয়ে জানতে পারেন তেল শেষ। এই পাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, রাতে বেশি দামে তেল বিক্রি করেন মজুদদারদের কাছে। আর দিনে পাম্প বন্ধ রেখে বলেন, তেল নাই।
কালীগঞ্জ উপজেলার চাপারহাট পাম্পেও একই চিত্র বলে অভিযোগ করেছেন শত শত মোটরসাইকেল চালক।
মোটরসাইকেল চালক রবিউল ইসলাম। তার বাড়ি দইখোয়া এলাকায়। তিনি বলেন, কয়েকদিন ধরে ২৫০ টাকা ও ৩০০ টাকা লিটার তেল কিনেছেন মুদি দোকানগুলোতে। তবে তারা এক লিটারের বেশি দেন না। কাশিম বাজার হাট, বোর্ডের হাট, চামটা হাট ও দলগ্রাম হাট এবং এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দুয়েকটি দোকানেও তেল কিনতে পাওয়া যায় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা লিটার। এসব মুদি দোকান তেল কোথায় পান জানতে চাইলে রবিউল বলেন, যুদ্ধের পরপরই কেউ কেউ ড্রামে মজুদ করেছে আবার্ এখনো অনেকে রাতে পাম্পগুলো থেকে বেশি দামে ড্রামে তেল এনে মজুদ করছে। সেগুলোই সারাদিন বিক্রি করে তারা।
২৬ মার্চ রাত ৮টা। কালভৈরব বাজার থেকে ডিজেল কিনে অটোতে যাচ্ছিলেন কাকিনার আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, ১৪০ টাকা লিটার ডিজেল কিনে যাচ্ছি। ফোনে ২০ লিটার দেওয়ার কথা থাকলেও দিলেন সাড়ে ১২ লিটার। মেশিন চালানোর তেল নাই। জমিতে সেচ দিতে হবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সবাই সবকিছু জানেন তারপরও কোনো অ্যাকশন নাই। সরকারি দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য সবাই সব জানেন। তবুও যেন এভাবেই চলছে। অথচ তারা সরোব হলে কৃষকের দুরদশা হয় না।
অভিযোগ
তেল নিয়ে যেখানেই যে দোকানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে, ওই দোকানকে সবাই চেনেন ও জানেন। তিনি মজুদ করা তেল প্রকাশ্যেই বিক্রি করে চলেছেন অথচ কেউ কিছু বলছে না। দেশে এত এত গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য থাকতে প্রশাসন যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। পুলিশের কোনো পদক্ষেপ নাই। জেলা গোয়েন্দা পুলিশও নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন। অথচ এসবি, এনএসআই, ডিজিএফআই, ডিবি পুলিশ, থানা পুলিশ, ভোক্তা অধিকার, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন সবাই যেন নিশ্চুপ। এ ছাড়া জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও সরকারি দলের ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে একাধিক কমিটি রয়েছে। তারপরও কেন তদারকি হচ্ছে না। কোথায় ঘাটতি এই মজুদদারদের ধরতে, নাকি তারাও বেশি দামে বিক্রি করা তেলের টাকার ভাগ পাচ্ছেন সবাই- এমন প্রশ্নও করেছেন অনেকে।
প্রতিকার
অভিযোগকারীদের পরামর্শ, প্রশাসনের সাথে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা যদি মজুদদারদের সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিতে সোচ্চার হয় তাহলে তেলের দাম কেউ বেশি নিতে পারবেন না। অভিযান বাড়াতে হবে একই সাথে ধরা পড়া জ্বালানি তেল বাজেয়াপ্ত করতে হবে। সকল গণমাধ্যমে প্রচার প্রচারণা বাড়াতে হবে। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সকলকে সোচ্চার করতে হবে।
জ্বালানিমন্ত্রীর সহজ স্বীকার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে কোনো জ্বালানি তেলের সংকট নেই। তবে সিন্ডিকেট করে অনেকে তেল কালোবাজারি করছে। তারা মজুদ করে বেশি দামে বিক্রি করছে। এদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অভিযানে হাজার হাজার লিটার তেল উদ্ধার হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
লালমনিরহাট পুলিশ সুপারের বক্তব্য
লালমনিরহাট পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জ্বালানি তেল মজুদ করে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে এমন অভিযোগ পেয়ে জেলা জুড়ে অভিযান অব্যাহত আছে। অনেক জায়গায় আমরা তেল উদ্ধার করেছি। উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা মাঠে নেমেছে। কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। যাতে গাড়ির বৈধ কাগজপত্র ছাড়া কেউ জ্বালানি তেল না পায়। আর রাতে কালোবাজারিতে তেল বিক্রি বন্ধ করতে গোয়েন্দা কার্কম শুরু করা হয়েছে। তিনি সাধারণ জনগণকে আরও বেশি সোচ্চার হওয়ার কথা বলেন।