ঢাকা: ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সামনে পাল্টা কর্মসূচি পালন করেছে ব্যাংকটির গ্রাহকরা। এসময় তাদের আসতে দেখে সরে পড়েন পটিয়া থেকে আসা চাকরিচ্যুত আন্দোলনকারীরা।
রোববার (১৯ এপ্রিল) সকাল দশটার দিকে হঠাৎ করেই মতিঝিলের দিলকুশা এলাকায় তারা অবস্থান নেয়। এ সময় তারা বর্তমান পর্ষদ বাতিল করতে হবে, আগের মালিকদের হাতে ব্যাংক ফিরিয়ে দিতে হবে, চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল করতে হবেসহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে।
পরবর্তীতে দুপুর ১২টার দিকে একই স্থানে কর্মসূচি পালন করার জন্য আসেন গ্রাহকরা। তখন চাকরিচ্যুত আন্দোলকারীরা সরে পড়েন।
এ সময় ইসলামী ব্যাংক-কে ধ্বংস করতে পরিকল্পিতভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের সভাপতি নুর নবী মানিক।
তিনি বলেন, একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংককে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তীতে ব্যাংকটিকে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন আনা হয়। ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যানকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং একই রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের কিছু শীর্ষ ঋণখেলাপি ও ব্যাংক লুটেরা ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এসব অর্থ পরে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওইসব ব্যক্তি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে, যা পুরো ব্যাংক খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
ব্যাংক খাত সংস্কারের নামে প্রণীত ব্যাংক রেজুলেশন আইন সংশোধনেরও কঠোর সমালোচনা করেন নুর নবী মানিক। তিনি বলেন, এই আইনের ১৮(ক) ধারা সংশোধনের মাধ্যমে ঋণখেলাপি ও ব্যাংক লুটেরাদের পুনরায় ব্যাংকের মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু অন্যায় নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যারা নিজেদের ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ, তারা কীভাবে আবার ব্যাংক কেনার মতো আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করবে।
তার দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ এই ধারার বিরোধিতা করলেও কোনো আলোচনা ছাড়াই এটি আইনে পরিণত করা হয়েছে। এতে করে সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নুর নবী মানিক আরও বলেন, সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের সামনে কিছু ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছে। তার অভিযোগ, এসব ব্যক্তির মধ্যে অনেকেই প্রকৃত ব্যাংক কর্মচারী নন, বরং ভুয়া সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেওয়া হয়েছে এবং পরে তাদের চাকরি নিয়মিত করার প্রক্রিয়ায় তারা বাধা সৃষ্টি করছে। যারা প্রয়োজনীয় যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেনি, তাদের পুনর্বহালের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে যদি ইসলামী ব্যাংকের সামনে এ ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে গ্রাহকরা বসে থাকবে না। তারা শান্তিপূর্ণভাবে পাল্টা কর্মসূচি গ্রহণ করবে এবং প্রয়োজন হলে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
এ সময় তিনি বলেন, ব্যাংক খাতকে লুটেরাদের কবল থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। এ লক্ষ্যে আগামী ১৫ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এই কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ব্যাংকটির সামনে অবস্থান, সারাদেশে জনমত গঠন, লিফলেট বিতরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, সমাবেশ ও সেমিনার আয়োজন।
নুর নবী মানিক বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ব্যাংক লুটেরাদের গ্রেফতার নিশ্চিত করা, তাদের দেশি-বিদেশি সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংকের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে তিনি দাবি জানান, ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা অবৈধভাবে যাদের হাতে গেছে, তাদের কাছ থেকে তা ফিরিয়ে নিয়ে সৎ ও স্বচ্ছ উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায় দেশের কোটি কোটি মানুষের সঞ্চয় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ব্যাংক খাত রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং এই আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। পরবর্তী কর্মসূচি বিস্তারিতভাবে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে বলেও তিনি জানান।