Friday 01 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রক্তে লেখা মে দিবস

সানজিদা যুথী সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১ মে ২০২৬ ১৩:২৯ | আপডেট: ১ মে ২০২৬ ১৩:৩৩

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা মে দিবস কেবল একটি তারিখ নয়, এটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাসে এক রক্তঝরা মাইলফলক। ১৮৮৬ সালের Haymarket Affair-এর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আন্দোলন আজ বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, সম্মান ও মানবিক কর্মপরিবেশের প্রতীক হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের শোষণ, অমানবিক কর্মঘণ্টা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শ্রমিকরা যে সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠা পায় ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের ন্যায়সংগত দাবি— যা আজকের আধুনিক শ্রমব্যবস্থার ভিত্তি।

উনিশ শতকের শেষভাগে শিল্পবিপ্লবের পর শ্রমিকদের জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ, সপ্তাহে ছয় দিন শ্রম, অথচ মজুরি ছিল সামান্য। মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য এই শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হতে শুরু করেন। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের শ্রমিকরা দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন এবং ১৮৮৬ সালের ১ মে-কে সময়সীমা নির্ধারণ করেন। দাবি আদায় না হওয়ায় ১ মে থেকে শুরু হয় ব্যাপক ধর্মঘট।

বিজ্ঞাপন

এরই ধারাবাহিকতায় ৪ মে শিকাগোর হে মার্কেট স্কোয়ারে এক সমাবেশে আকস্মিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। এতে এক পুলিশ সদস্য নিহত হন এবং পরবর্তীতে পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলি চালালে বহু মানুষ হতাহত হন। এই ঘটনার জেরে শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে বিতর্কিত বিচার হয় এবং কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে শ্রমিক নেতা আগস্ট স্পীজের সেই ঐতিহাসিক উক্তি— “আজ আমাদের এই নীরবতা, তোমাদের আওয়াজের চেয়েও শক্তিশালী হবে”—আজও শ্রমিক আন্দোলনের প্রেরণা হয়ে আছে।

পরবর্তীতে ১৮৮৯ সালে Second International ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে International Labour Organization (আইএলও) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়।

বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে মে দিবস সরকারি ছুটি হিসেবে পালিত হয়। বাংলাদেশেও দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপিত হয়। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান র‌্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে। তবে বাস্তবতায় এখনও শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, বিশেষ করে শিল্পখাতে নিরাপত্তা, কর্মঘণ্টা ও মজুরি সংক্রান্ত বিষয়ে।

মে দিবস তাই শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতি নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এক সতর্কবার্তা। শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এখনও শ্রমিকদের নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে বহু প্রশ্ন রয়ে গেছে। তাই এই দিনে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ— যেখানে শ্রমিকের মর্যাদা, অধিকার ও মানবিক জীবনযাপন নিশ্চিত হবে। কারণ, শ্রমিকের ঘামেই গড়ে ওঠে অর্থনীতি— আর সেই ঘামের যথাযথ মূল্যায়নই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের মূল ভিত্তি।

সারাবাংলা/এসজে/এএসজি
বিজ্ঞাপন

রক্তে লেখা মে দিবস
১ মে ২০২৬ ১৩:২৯

আরো

সানজিদা যুথী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর