Wednesday 06 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মমতার ভরাডুবি: তিস্তার পানির নায্য হিস্যা পাবে বাংলাদেশ?

অপূর্ব কুমার, ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট
৬ মে ২০২৬ ১৪:৩৮ | আপডেট: ৬ মে ২০২৬ ১৫:০৮

ঢাকা: দীর্ঘ পনের বছর পর পশ্চিমবাংলা তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে। মমতা ব্যানার্জির দলের হারের পর ক্ষমতায় বসছে কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। মমতা ব্যানির্জির হারের পর বাংলাদেশের মানুষের মনে চাওয়া তিস্তা নদীর পানির নায্য হিস্যা মিলবে কি? এ প্রশ্নটি তিস্তা পাড়ের মানুষ, রাজধানীবাসী থেকে শুরু করে সর্বত্র ঘুরপাক খাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা মমতার হারে তিস্তা পাড়ের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বিষয়টি খুব সহজ নয় বলেও মন্তব্য করেছেন কূটনীতিক বিশ্লেষকরা।

কূটনীতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহু বছর ধরে বাংলাদেশের তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি করে আসছে। তবে দাবি করলেইে তো হবে না, এজন্য উজানের দেশ ভারতের সঙ্গে চুক্তি জরুরি। অতীতে বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এই চুক্তির খসড়া তৈরি করেও তা সই করা হয়নি, কারণ বিরোধিতা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে, মূলত রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণেই ঝুলে গেছে পানি চুক্তি।

বিজ্ঞাপন

তবে পশ্চিমবঙ্গে যখন রাজনীতির হাওয়া পাল্টে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছ থেকে ক্ষমতা গেছে বিজেপি’র হাতে। সঙ্গতকারণেই ঢাকায় সর্বত্র আলোচনা এবার কি তিস্তা পাড়ের মানুষের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়বে।

এর আগে ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়। মূলত শুকনো মৌসুমে (ডিসেম্বর-মার্চ) পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ২০১১ সালে খসড়া চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ৩৭.৫ শতাংশ এবং ভারত ৪২.৫ শতাংশ পানি পাওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে এটি আর সই করা হয়নি। দুই দেশের সরকারই ১৫ বছরের জন্য চুক্তি সই করতে সম্মত হলেও শেষ মুহূর্তে মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতায় সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

চুক্তি ঠেকানোর জন্য মমতা ব্যানার্জি নানা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিশেষজ্ঞ প্যানেল দিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন তৈরি করান এবং সেসব প্রতিবেদনে বলা হয়—কৃষকরা যতটা সেচের পানি আশা করছেন, আসলে তিস্তায় তার ১৬ ভাগের একভাগ পানিও নেই। প্রথম প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিষয়ে ইতিবাচক পরামর্শ থাকলেও তা প্রকাশ করেনি পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন সরকার। সেই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হওয়ায় পুনরায় আবারও প্রতিবেদন তৈরি করানো হয় অন্য বিশেষজ্ঞ দিয়ে। মমতা ব্যানার্জি বরাবরই বলার চেষ্টা করেছেন যে, তিস্তায় পানি নেই।

একই সময়ে মমতা বিকল্প নদীর প্রস্তাব তুলে ধরেন। এরই অংশ হিসেবে ২০১৭ সালে তিস্তার সমস্যা মেটাতে তোর্সা, জলঢাকাসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি নদীর পানিবণ্টনের বিকল্প প্রস্তাব দেন মমতা। মূলত নানাভাবে বাধা দিতেই তিনি এসব পদক্ষেপ নেন।

ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্র দাবি করেছে, কংগ্রেসের বিজেপি সরকারও চেয়েছিল তিস্তার পাণির হিস্যা নিয়ে চুক্তি করতে। কিন্তু মমতার বিরোধের কারণে কোনও সরকারই তিস্তা চুক্তি নিয়ে এগোতে পারেনি। ২০২৪ সালেও তিস্তার পানি দিলে ভারতজুড়ে আন্দোলনের হুমকি দেন মমতা।

সিকিম থেকে উৎপত্তি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদী নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী দিয়ে ১২৪ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। একসময় বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত এই নদী বর্তমানে পানিশূন্যতার কারণে মারাত্মক সংকটে পড়েছে। গত ১৫ বছরে যতবার মমতা ক্ষমতায় গেছেন, ততবারই তিস্তার পানি নিয়ে আশাহত হতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তার পানি এখন রাজনৈতিক ইস্যু। আগেও তাই ছিল। বিজেপি ক্ষমতায় এলেও বিরোধী হিসেবে মমতা এখনও বিরোধিতা করবেন বলে ধারণা তাদের।

লেখক, গবেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, এতদিন দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জির আপত্তির অজুহাত দিতো। এখন কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় জায়গায় একই দল ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশ পানিবণ্টনের বিষয়ে জোরালো দাবি তোলার একটি পরিষ্কার সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি গঙ্গাচুক্তির নবায়ন ও ভিসা সমস্যা সমাধানের বিষয়েও আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যেহেতু নয়াদিল্লিতে যেই দল পশ্চিমবঙ্গের সেই দল, ফলে নয়াদিল্লির সরকারকে রাজি করালে পশ্চিমবঙ্গের সরকারের সেটার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যুক্তি থাকে না। ফলে বাংলাদেশের জন্য এই নয়াদিল্লির সরকারকে রাজি করাতে পারলে—পানি পাওয়ার একটা রাস্তা হয়। কিন্তু ব্যাপারটা হয়তো এত সহজ হবে না, কারণ প্রদেশের একটা ইন্টারনাল পলিটিক্স আছে। পানিতে বাধা সরিয়ে নেবে, বিরোধী দলগুলো আবার চুপ করে বসে থাকবে, এমন তো হয় না।

সাবেক একজন রাষ্ট্রদূত বলেন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে জয়ী হলেও তিস্তা পানিচুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকবে। একইভাবে গঙ্গা পানিচুক্তির নবায়নের কী হবে, কতটুকু হবে—তা নিয়েও ধোঁয়াশা আছে। তবে গঙ্গা পানিচুক্তি প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক নিয়মেই ভারত থেকে বয়ে আসা নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা পাবে বাংলাদেশ।’

সারাবাংলা/একে/এসআর