Saturday 09 May 2026
সারাবাংলা: লেটেস্ট বাংলা খবর | ব্রেকিং নিউজ | Sarabangla.net

‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ কার্যকর
ব্যাংক বন্ধ হলেও ৭ দিনের মধ্যে মিলবে টাকা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৭ মে ২০২৬ ১৪:৫৭

ঢাকা: দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নতুন ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ কার্যকর করেছে সরকার। এ আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের মুখে পড়লে আমানতকারীরা সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যেই তাদের সুরক্ষিত আমানতের অর্থ ফেরত পাবেন। একই সঙ্গে আমানত সুরক্ষার সীমাও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে একজন আমানতকারী সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষা পেতেন, এখন তা বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে।

বুধবার (৬ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আইনের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স বিভাগ দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাঠিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানি অবসায়নের আওতায় এলে অবসায়ক বা লিকুইডেটরের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য আমানতকারীকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করতে হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন।

আইনে আরও বলা হয়েছে, অর্থ পরিশোধ নিয়ে কোনো আমানতকারীর আপত্তি থাকলে তিনি ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ জানাতে পারবেন। এরপর আমানত সুরক্ষা বিভাগ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সাত দিনের মধ্যেই অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, আগে কোনো ব্যাংক বন্ধ হলে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতো। নতুন আইন সেই জটিলতা অনেকটাই কমাবে।

নতুন আইনে আমানত সুরক্ষার সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে একজন গ্রাহক অন্তত ২ লাখ টাকা পর্যন্ত নিশ্চয়তা পাবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, নতুন আইনে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে কোনো ব্যাংক বন্ধ হলে আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পেতেন, এখন তা বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র আমানতকারীরা বেশি উপকৃত হবেন। তবে বড় করপোরেট গ্রাহকদের জন্য এর প্রভাব তুলনামূলক কম হবে।

তিনি আরও বলেন, আমানত রাখার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ঝুঁকি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। শুধুমাত্র বেশি মুনাফার লোভে দুর্বল প্রতিষ্ঠানে অর্থ রাখা ঠিক হবে না।

আইনে বলা হয়েছে, কোনো আমানত ১০ বছর পর্যন্ত সুরক্ষিত থাকবে। এই সময়ের মধ্যে আমানতকারী তার অর্থ দাবি করতে পারবেন। তবে ১০ বছরের মধ্যে দাবি না করলে পরবর্তীতে আর সেই অর্থ দাবি করার সুযোগ থাকবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে অনাদায়ী বা অদাবিকৃত আমানতের বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় আগে নানা জটিলতা তৈরি হতো। নতুন আইন সেই অনিশ্চয়তা দূর করবে।

অবসায়নের কারণে আমানত ফেরতে যে অর্থ ব্যয় হবে, তা পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে আদায় করা হবে। অর্থাৎ প্রথমে আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে গ্রাহকদের টাকা দেওয়া হলেও পরে সেই অর্থ প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ থেকে পুনরুদ্ধার করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে একদিকে যেমন আমানতকারীদের দ্রুত অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে, অন্যদিকে তহবিলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপও কমবে।

নতুন আইনের আওতায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক দুটি আমানত সুরক্ষা তহবিল গঠন করা হবে। এই তহবিল থেকেই সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি ‘ডিপোজিট প্রোটেকশন বিভাগ’ থাকবে, যারা এই তহবিল পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে তারা ব্যাংক পরিদর্শন, তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান শনাক্ত এবং প্রয়োজনে পুনর্গঠন কার্যক্রমেও অংশ নিতে পারবে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ব্যাংক বন্ধ হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলে হবে না; ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আগেভাগে শনাক্ত করতে পারলে বড় ধরনের সংকট এড়ানো সম্ভব। নতুন বিভাগ সেই কাজেও ভূমিকা রাখবে।

আইনে বলা হয়েছে, ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে নির্ধারিত প্রিমিয়াম বা কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান সময়মতো তা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে জরিমানা আরোপ করা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে অর্থ কেটে নেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে কর্তৃপক্ষের।

টানা দুই প্রান্তিকে প্রিমিয়াম বা জরিমানা পরিশোধ না করলে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তাদের নতুন আমানত গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।
পুনরাবৃত্তি ঘটলে ব্যাংকের ক্ষেত্রে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এবং ফাইন্যান্স কোম্পানির ক্ষেত্রে ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নতুন আইনে আমানত সুরক্ষা তহবিলের আয়, মুনাফা বা প্রাপ্ত অর্থ করমুক্ত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর আইনে সংশোধন এনে এটি কার্যকর করবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, করমুক্ত সুবিধা দেওয়ায় তহবিল দ্রুত শক্তিশালী হবে এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে।

আইনে আরও বলা হয়েছে, প্রতি বছর প্রথম তিন মাসের মধ্যে আমানত সুরক্ষা তহবিলের নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে এবং সেই প্রতিবেদন সরকারকে দিতে হবে। প্রতিবেদনের তথ্য জনসাধারণের জন্য প্রকাশযোগ্য থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান হবে। সরকারের অনুমোদনক্রমে গঠিত ট্রাস্টি বোর্ড প্রয়োজনীয় বিধি ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারবে।

নতুন আইনের আওতায় সাধারণ আমানতকারী ছাড়াও সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিদেশি সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সুরক্ষা সুবিধা পাবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২ লাখ টাকার সীমা ক্ষুদ্র ও মাঝারি আমানতকারীদের জন্য সহায়ক হলেও বড় অঙ্কের আমানত রাখা গ্রাহকদের জন্য এটি যথেষ্ট নয়। ফলে বড় আমানতকারীদের এখনও ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি বিবেচনা করে অর্থ রাখতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোথাও তারল্য সংকট, কোথাও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আমানত ফেরত পেতে ভোগান্তিতেও পড়েন গ্রাহকেরা।

এ প্রেক্ষাপটে নতুন আমানত সুরক্ষা আইনকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, দ্রুত অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা এবং শক্তিশালী সুরক্ষা কাঠামো ব্যাংক খাতে জনগণের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করবে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু আইন করলেই হবে না; কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক চিহ্নিত করা, নিয়মিত তদারকি জোরদার করা এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। না হলে আইন থাকলেও গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি ফিরবে না।

তাদের মতে, নতুন আইন ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য ইতিবাচক হলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর