Saturday 09 May 2026
সারাবাংলা: লেটেস্ট বাংলা খবর | ব্রেকিং নিউজ | Sarabangla.net

জুলাই-একাত্তরকে মুখোমুখি দাঁড় না করিয়ে কর্মসংস্থানের দিকে নজর দিন

গোলাম সামদানী
৯ মে ২০২৬ ১৮:০৮

ঢাকা: বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় একটি স্থান দখল করে আছে জুলাই। সদ্য সমাপ্ত সংসদ অধিবেশনের অনেক সময়জুড়ে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেকে জুলাই ও একাত্তরকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন উসকে দিতে চাচ্ছে। এটাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। বরং, এই ধরনের বিভাজনের রাজনীতি সরকার ও বিরোধীদলকে পরিহার করে তরুণ প্রজন্মকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এটাই হবে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই চেতনার বাস্তবায়ন। পাশপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে এসেই ঘোষণা দিয়েছেন যে, বিএনপি সরকার গঠন করলে ১৮ মাসের মধ্যে এককোটি যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। এখন সে দিকে বিএনপি সরকারকে মনযোগী হতে হবে। পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নিলে এক থেকে দেড় বছরে এক কোটি যুবকের কর্মসংস্থান সম্ভব।

বিজ্ঞাপন

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন একাত্তরে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন। এই অর্জনের সঙ্গে, এই বিজয়ের সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা করা যায় না। দায়িত্বশীল কেউ করেছেন বলেও জানা নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে ’৭১ কে কেউ কেউ ’২৪ এর সঙ্গে তুলনা করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়, বরং নিন্দনীয়। এমনকি কোনোটা বড়, কোনটা কম এই আলোচনাও অর্থহীন। এটা করা হলে মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করা হবে। একাত্তর না হলে আমরা স্বাধীন দেশ পেতাম না, আবার জুলাই না হলে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে আপাতত বাংলাদেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ভোটের অধিকার, মানবাধিকার, গুম, খুন, মিথ্যা ও গায়েবি মামলা থেকে জনগণ দ্রুত সময়ের মধ্যে মুক্ত হতো কি না তা যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

ফলে একাত্তরের সঙ্গে জুলাই বিপ্লবকে তুলনা করে নতুন এক বিতর্কের মধ্যে রাজনীতিকে ঢুকিয়ে দেওয়ার অর্থই হচ্ছে, পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেওয়া। ছাত্র-জনতা রাজপথে রক্ত দিয়ে দেশকে ফ্যাসিস্টমুক্ত করে গণতন্ত্র উত্তরণের সুযোগ করে দিয়েছে। আমাদের এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। তাই সরকার ও বিরোধীদলসহ সব রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে গণতন্ত্র পুরুদ্ধারে কাজ করতে হবে। সেইসঙ্গে বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জনবান্ধব পদক্ষেপ নিতে হবে।

বর্তমানে আমাদের সমস্যার কোনো শেষ নেই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। বিগত সরকারের নানামুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শিক্ষা ব্যবস্থা একেবারেই বিপর্যস্থ। লুটপাট করে ব্যংককিং খাত একেবারেই দেওলিয়া করে দিয়ে গেছে। বিগত সরকারের নেওয়া বিরাট অংকের ঋণের ভার এখন নতুন সরকারের কাঁধে এসে পড়েছে। সবদিক থেকে বিধ্বস্ত অবস্থায় বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এই দায়িত্ব নিতে না নিতেই ইরানের সঙ্গে ইসরাইল ও আমেরিকার যুদ্ধ বৈশ্বিক পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। এরকম পরিস্থিতিতে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার ও শিক্ষা স্বাস্থ্য খাতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো পুনর্গঠন বিএনপির সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নতুন নতুন শিল্পায়নের পুঁজির যোগানের বড় উৎস হতে পারে শেয়ার বাজার। এই শেয়ার বাজারকে দীর্ঘ দিন ধরে লুটপাটের মাধ্যমে একেবারে ধ্বংসের শেষ কিনারায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে ঐক্যমত্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদের প্রথম অধিবেশনে আলোচনায় স্থান পাওয়া দরকার ছিল। যারা জুলাই নিয়ে সবচেয়ে বেশি সরব, তাদের কাছে এই তথ্য উদ্বেগ তৈরি করার কথা। জুলাইয়ের মূল এজেন্ডা ছিল বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের বিষয়। জুলাই আন্দোলন শুরুই হয়েছিল চাকরিতে কোটার দাবিকে কেন্দ্র করে। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলন কখনোই সফল হতো না, যদি না ছাত্রদের সঙ্গে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক রাস্তায় নেমে না আসতো।

গত দেড় বছরে বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে হাজার হাজার শ্রমিক নতুন করে বেকার হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বন্ধ হওয়া গার্মেন্টেসের সংখ্যা নেহাত কম নয়। বেসরকারি খাত থেকে কী পরিমাণে বেকার হয়েছে রাস্তায় বাইকারের সংখ্যা দেখলে সহজে অনুমান করা যায়। আমাদের শ্রমশক্তির ৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশই তরুণ (১৫-২৯ বছর বয়সী)। প্রতিবছর প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তবে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের চাইতে বেশি। এই বেকারত্বের হারের ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার অত্যন্ত পীড়াদায়ক।

আমাদের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ যুবক, এদের মধ্যে ৩৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছর। পৃথিবীর অনেক দেশের অর্থনীতি যেখানে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ভারে চাপের মধ্যে আছে, সেখানে আমাদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় অংশ যুবক- এটা আশার দিক। ইউরোপের বহু দেশের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার এখন নেতিবাচক, এই নেতিবাচক জনসংখ্যার কারণে দেশগুলো তাদের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা ক্রমাগত রোবটের মতো প্রযুক্তি-নির্ভর হওয়ার চেষ্টা করলেও তাতে পুরোপুরি সমাধান আসছে না। জাপান, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো জনসংখ্যার নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত। দেশগুলোতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এই বিবেচনায় আমাদের উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা, বিশেষ করে জনসংখ্যার মধ্যে যুবকদের প্রাধান্য আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তা না হয়ে এই জনগোষ্ঠী এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে আছে। অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এই বেকারত্বকে অ্যাটমবোমার সঙ্গে তুলনা করেছে।

গত দেড় বছরে দেশের অভ্যন্তরে সরকারি-বেসারকরি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বেকারত্ব কমানোর জন্য সরকারি-বেসরকরি বিনিয়োগ খুব জরুরি। বিনিয়োগ না করে বরং পুঁজি পাচার হয়েছে। বেকারত্বের জন্য এই বিনিয়োগের ঘাটতি বড় একটা কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের স্কিলের ঘাটতি। দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অটোপাস, শতভাগ পাসের মতো আত্মঘাতী অপতৎপরতা চালাতে গিয়ে কোয়ালিটি এডুকেশন একেবারে শেষ করে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষার নাম একবারে তলানিতে। আন্তর্জাতিক কোনো র‌্যাংকিংয়ে আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আটশ’র ঘর অতিক্রম করতে পারছে না।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে এসেই ঘোষণা দিয়েছেন যে, বিএনপি সরকার গঠন করলে ১৮ মাসের মধ্যে তার সরকার এক কোটি যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। এই ঘোষণাটা নিঃসন্দেহে একটি সাহসী ও সময়োপযোগী ঘোষণা। জুলাই নিয়ে যত আলোচনাই হোক, এক কথায় বললে এককোটি যুবকের কর্মসংস্থানের ঘোষণাই হচ্ছে জুলাইয়ের মূল স্পিরিট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুঝতে পেরেছেন এই বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারলে কোনো উদ্যোগই টেকসই হবে না।

ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিএনপি এর মধ্যে অনেকগুলো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সামাজিক সেফটি নেট তৈরির এই উদ্যোগগুলো প্রশংসিত। কেননা বিগত দেড় যুগের অপশাসনে অনেক মানুষ অর্থনৈতিকভাবে তলনিতে নেমে গেছে। তাদের জন্য এই কর্মসূচি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে প্রান্তিক পর্যায়ে ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা প্রসারিত হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক্ষেত্রে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। তবে এর সঙ্গে দরকার বেকার সমস্যা দূর করা, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি কমানোর মতো উদ্যোগ নেওয়া; না হলে এইসব উদ্যোগ থেকে আখেরে সুফল পাওয়া যাবে না।

অন্যদিকে আমাদের বিদেশি মুদ্রার মজুদের অন্যতম ভরসা হচ্ছে রেমিট্যান্স। এই সেক্টর এখন অনেকাংশে সিন্ডিকেটের দখলে। জাপান বহু দিন থেকে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকেও চেষ্টা আছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সফলতা একেবারেই হতাশাজনক। অথচ ঢাকাসহ সারা দেশে বেসরকারি উদ্যোগে অসংখ্য জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার গড়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি সারাদেশে সরকারি টিটিসিগুলো তো আছেই। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার সময় ভূ-মধ্যসাগরে নৌকা ডুবিতে মৃত্যু কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। এসব করুণ মৃত্যু বর্হিবিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুঃখজনক হচ্ছে, আমাদের জনসংখ্যা আছে, কিন্তু দক্ষতা নেই। কেবল বিদেশে নয়, দেশের ভেতরেও স্কিল ম্যানপাওয়ারের চাহিদা রয়েছে। এখন জরুরি হচ্ছে বেকার যুবকদের দক্ষ জনশক্তিতে পরণিত করা।

বিজ্ঞাপন

আরো

গোলাম সামদানী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর