ঢাকা: ‘আমি চাঁদাবাজি এলাকার এমপি। আমার নির্বাচনী এলাকার মধ্যে শুধু কারওয়ান বাজার থেকে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা চাঁদা দিতে হয়। শুধু কয়েকটি মুরগির পাইকারি দোকান প্রতিদিন ৬০ হাজার টাকা চাঁদা দেয়। নিচে করে কিছু কর্মী, উপরে থাকে রাজনৈতিক ছায়া। এটা কারা করে? আরো স্পষ্ট করে বলা যায় যে, আগে চাঁদাবাজি করত সরকারি দলের লোক, এখনো করে সরকারি দলের লোক। এটা তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীমন্ত্রী জানতেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জানেন। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চাঁদার বিষয় জানে।’
আজ সোমবার (১৮ মে) নাগরিক প্ল্যাটফর্ম প্রাক-বাজেট সংলাপে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা ‘ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম খান।
তিনি আরও বলেন, সরকারের সবাই চাঁদার কথা জানে। এটা নিয়ে কথাবার্তা না বলা ভালো। এই চাঁদা নিয়ে নাড়াচাড়া বন্ধ করতে হবে।
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি মাহমুদা হাবীবা বলেন, চাঁদাবাজি হয়। চাঁদাবাজদের নাম সুনির্দিষ্ট করে বলতে হবে। চাঁদাবাজদের তালিকা দিতে হবে। কারওয়ান বাজারে ঢালাওভাবে চাঁদাবাজির বক্তব্য প্রত্যাখান করছি। আর চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে।
সিপিডি’র অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তওফিকুল ইসলাম খান বলেন, ইচ্ছাকৃত খেলাপির কোন নীতি সহায়তা দেওয়া উচিত না। যা খেলাপিকে উস্কে দিবে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল করতে হবে। কালো টাকা একটা পর্যায়ে তেমন একটা কাজ করে না। আয় বাড়াতে নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে৷ কিন্তু ন্যায় নীতির জায়গায় শক্তিশালী অবস্থানে ধরে রাখতে হবে। সরকারি কর্মচরিদের বেতন বাড়ানো দরকার। তবে তা কর আয় বাড়াতে কতটা সহায়ক হবে তা ক্লিয়ার করা উচিত।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে। তবে দাম খুব একটা বাড়ে নি। ভর্তুকির জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। যা যথেষ্ট নয়। মূলত ৬০ হাজার কোটি টাকা দরকার, যা আগে বলা হয়েছিল। অন্য পণের দামও বেড়েছে। যা কমাতে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দেখছি না। তাই সহসা কমছে না মূল্যস্ফীতি।
এডিপি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারকে প্রকল্প বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। ৯০ শতাংশ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নেই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প নিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দিতে হবে। কর আদায়ের সঙ্গে বাস্তবতার নিরীখে প্রকল্প নিতে হবে। কেননা, সরকার পরিচালনা ব্যয় নির্বাহের মত কর আয় করতে পারে না। সুতরাং বাজেট বাস্তবমুখী হলে বাস্তবায়ন হবে। আর সরকারের প্রথম বাজেট একটা বার্তা দিবে।
অনুষ্ঠনে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এক নাগরিকের জন্য একটি কার্ড থাকা জরুরি। এটা করতে পারলে ব্যাংক, স্বাস্থ্য সেবা, ভাতা সব মিলবে এক কার্ডে। এটা বাজেটে স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। আর নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে কোম্পানি বা ঠিকাদারকে না দিয়ে মা-বাবা ও অভিভাবকদের সংযুক্ত করতে হবে। তারা সন্তানকে ভেজাল খাবার খাওয়াবেন না। এটা নীতি নির্ধারকরা বিবেচনা করতে পারে।
তিনি বলেন,
সিপিডির গবেষনা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাজেট মানে ন্যায় হিসাব করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ ২ লাখ ৪১ হাজর কোটি টাকা। এটা ডিসিপ্লিনের বাধা। ঋণ একটা অপরিহার্য হয়ে দাড়িয়েছে। ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হবে। যদিও টাকার গায়ে তা লেখা থাকবে না৷ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৪ হাজার ৯০০ পণ্য আমদানি করতে শুন্য শুল্ক লাগবে৷ সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী এসব পণ্য আমদানি করতে শুন্য শুল্ক না করে উপায় নেই।
বিকেএমইএ সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, বাজেট বাস্তবায়নর গুরুত্ব দিদে হবে। বাজেটে বরাদ্দের দাবির পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যবহার নিয়ে সোচ্চার হতে হবো। বাজেটে বরাদ্দ নিয়ে সুশাসন পালন করতে হবে। কেননা, ব্যয় প্রাক্কলনের সময় দুর্নীতির সুযোগ রাখা হয়। এসব খেয়াল রাখা জরুরি।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে পর্যাপ্ত তারল্য নেই। আস্থার ঘাটতি। বিনিয়োগে আস্থা এসেছে৷ সময নিয়ে আগাতে হবো। তিন মাসের সরকারকে দোষ দিতে মন চায় না। এবার বিনিয়োগের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। তবে সবমিলিয়ে অটোমেশন খুব জরুরি। এটা করতে পারলে দ্রুত সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবো। এটা নিয়ে কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করতে হবে।
ডিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ২০১২ সালের বন্ধ গার্মেন্টসে রিফাইনান্স করা হচ্ছে না। প্রি ফাইনান্স ও রিফাইনান্স তো দরকার। ফ্যামিলি কার্ড দরকার রয়েছে। অটোমোশনের জন্য চার্জ করা হচ্ছে, সেবা আশানুরূপ না। অটোমোশন ও ইনোভেশন জরুরি। বর্তমান অটোমেশন কাজ না করলে রফতানি করা যায় না। পারফরমেন্স রিলেটেড ইনসেন্টিভ চালু করা দরকার।
ক্যাব-এর প্রধান শফিকুজ্জামান বলেন, আমদানি করা নিত্যপণ্যের কর কমাতে হবো। তেলের দাম বেড়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। বিনিয়োগের জন্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. গেইল মারটিন বলেন, সরকার কয়েক বছর ধরে প্রকল্পভিত্তিক ব্যয় করতে পারে না। তবু বিদেশ থেকে অর্থায়ন সংগ্রহে বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছে। পরিস্থিতি উপলদ্ধি করে সরকারকে অব্যবহৃত অর্থ ভিন্ন প্রকল্পে ব্যয়ের সম্মতি দেওয়া হয়েছে। তবু যেন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়। তবে জ্বালানি, সার ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ে বৈদেশিক অর্থ ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা উচিত।