বাকৃবি: কুরবানির চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে পর্যাপ্ত সোডিয়াম ক্লোরাইড (সাধারণ লবণ) ব্যবহার করলে চামড়া পঁচে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং পরবর্তী ধাপে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পায়। এতে পরোক্ষভাবে পরিবেশে ক্রোমিয়াম দূষণের ঝুঁকিও কমতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক ড. শিহাব উদ্দিন।
পবিত্র ঈদুল আযহায় সারাদেশে লাখো পশু কুরবানি হলেও চামড়ার সঠিক সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ না হলে চামড়ার মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলে বিষাক্ত ভারী ধাতু ক্রোমিয়াম ছড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
চামড়া সংরক্ষণে লবণ ব্যবহারের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে ড. শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘কুরবানির পর চামড়া সংগ্রহের সময় পর্যাপ্ত সোডিয়াম ক্লোরাইড বা সাধারণ লবণ ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে চামড়া পঁচে না যায় এবং ট্যানারিতে পৌঁছানো পর্যন্ত ভালো থাকে। শুরুতেই পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার করলে পরবর্তী প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন কমে যায়। অন্যদিকে কম লবণ ব্যবহার করলে চামড়া দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই চামড়া সংরক্ষণে পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।’
চামড়া সংরক্ষণের স্থান ও পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সংগ্রহ করা চামড়া কখনও রোদে বা খোলা স্থানে ফেলে রাখা উচিত নয়, কারণ এতে লবণের কার্যকারিতা কমে যায় এবং চামড়া দ্রুত নষ্ট হতে পারে। চামড়া শেডের নিচে বা পাকা স্থানে সংরক্ষণ করা উচিত। বাজার বা নির্ধারিত সংগ্রহকেন্দ্রের উঁচু পাকা অবকাঠামো এ কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। নিচে পলিথিন বা জলরোধী আবরণ ব্যবহার করলে লবণমিশ্রিত তরল বর্জ্য আশপাশের মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়া কমানো সম্ভব। পরবর্তীতে এসব বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ ও নিষ্পত্তি করা উচিত।’
ক্রোমিয়ামের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্রোমিয়ামের প্রধান দু’টি অবস্থা হলো ট্রাইভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম [Cr (III)] এবং হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম [Cr (VI)]। এর মধ্যে হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ট্যানারি শিল্পে সাধারণত ট্রাইভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম ব্যবহৃত হলেও অনুপযুক্ত ব্যবস্থাপনার কারণে তা পরিবেশে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়ামে রূপান্তরিত হতে পারে। তাই ট্যানারি বর্জ্য পরিবেশে ছাড়ার আগে যথাযথভাবে শোধন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে তিনি জানান, দীর্ঘসময় ধরে ক্রোমিয়ামের সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুস, লিভার ও কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গে জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ট্যানারি কারখানার শ্রমিকরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE), মাস্ক ও নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলে ক্রোমিয়ামের প্রভাব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত ক্রোমিয়াম মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে। এতে পাতায় ক্লোরোসিস বা হলুদভাব দেখা দেয়, শ্বসন ও সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফসলের উৎপাদন কমে যায়। ট্যানারি বর্জ্যমিশ্রিত পানি সেচ বা ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে কৃষিজমিতে পৌঁছালে শাকসবজি ও ধানের মতো ফসলের ভোজ্য অংশে ক্রোমিয়াম জমা হতে পারে, যা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’
ক্রোমিয়াম বর্জ্য শোধন ও পুনর্ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কমন ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে (CETP) ট্যানারি বর্জ্য শোধনের পর তরল ও কঠিন—উভয় ধরনের বর্জ্য তৈরি হয়। কঠিন অংশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্রোমিয়াম থেকে যায়, যা উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। পুনরুদ্ধার করা ক্রোমিয়াম পুনরায় ট্যানিং প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা গেলে পরিবেশ দূষণ কমার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও কমতে পারে।’
ক্রোমিয়ামের বিকল্প ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে তিনি বলেন, ‘তুলনামূলক কম বিষাক্ত বিকল্প ট্যানিং উপাদান নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। তবে বাংলাদেশে এখনও সেগুলোর ব্যবহার সীমিত।’
তাই দেশের ট্যানারি শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করতে সাভারের বিসিক শিল্পনগরীসহ সব ট্যানারিতে আধুনিক বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং ক্রোমিয়াম পুনরুদ্ধার প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা জরুরি বলে তিনি মত দেন।