ঢাকা: রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল আজহা। পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে যারা কর্মব্যস্ততা বা অন্য কোনো কারণে এত দিন ঢাকা ছাড়তে পারেন নি, তারা আজ শেষ মুহূর্তে নাড়ির টানে রওনা হয়েছেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তের এই ঈদযাত্রায় আনন্দের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে চরম ভোগান্তি। বুধবার (২৭ মে) সকাল থেকেই রাজধানীজুড়ে শুরু হওয়া মুষলধারে বৃষ্টি আর বৈরী আবহাওয়া এই দুর্ভোগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ভোর থেকেই ঢাকার আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। সকাল গড়াতেই শুরু হয় তীব্র বৃষ্টি। আচমকা এই বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন ব্যাগ, লাগেজ এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে টার্মিনালমুখী হওয়া মানুষগুলো। রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এবং সদরঘাট লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখা যায় চেনা দুর্ভোগের ভিন্ন চিত্র। বৃষ্টির কারণে চারপাশ স্থবির হয়ে পড়লেও ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ছাতা মাথায় দিয়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজেই নারী ও শিশুদের নিয়ে যাত্রীদের ট্রেনের বগি বা বাসের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

-ছবি : সারাবাংলা
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে পড়েছে। আর প্রধান সড়কগুলো ফাঁকা থাকলেও মোড়ে মোড়ে ছিল গণপরিবহনের তীব্র সংকট। এই সুযোগে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশাচালকরা দুই থেকে তিন গুণ বেশি ভাড়া দাবি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। নিরুপায় হয়ে অনেককে বৃষ্টিতে ভিজেই খোলা রিকশা বা পিকআপ ভ্যানে করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হতে দেখা গেছে।
মহাখালী বাসস্ট্যান্ডজুড়ে প্রায় প্রতিটি পরিবহনের কাউন্টারের সামনেই ছিল বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি। বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলাচলকারী ইউনাইটেড ট্রান্সপোর্টের কাউন্টারে সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ ও বাসে ওঠার অপেক্ষা করতে দেখা যায় যাত্রীদের। যাত্রীদের অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে কাউন্টারে অবস্থান করেন। কেউ কেউ আবার নির্ধারিত সময়ের আগেই উপস্থিত হয়ে অপেক্ষা করছেন।
মহাখালী বাসস্ট্যান্ড অপেক্ষারত যাত্রী তানভীর বলেন, শেষ মুহূর্তে চাপ বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে। তবে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে বাড়িতে তো যেতেই হবে। যেহেতু আজ ঈদের আগের দিন, তাই কষ্ট কিছুটা করতেই হবে সেটা মেনেই নিয়েছি।

-ছবি : সারাবাংলা
কমলাপুর স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষারত বেসরকারি চাকরিজীবী ইমরুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অফিসের শেষ মুহূর্তের কাজ শেষ করে আজ সকালে বের হয়েছি। ভেবেছিলাম আজ ভিড় কম হবে। কিন্তু সকালের এই বৃষ্টি সব পরিকল্পনা নষ্ট করে দিল। ছোট বাচ্চা আর ব্যাগ নিয়ে স্টেশনে আসতেই পুরো ভিজে গেছি। এখন ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় না হলেই বাঁচি, নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানোটাই এখন বড় বিষয়।
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে বাসের জন্য অপেক্ষারত সুমি আক্তার বলেন, রাস্তায় লোকাল বাস বা সিএনজি কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। যা-ও পাওয়া যাচ্ছে, ভাড়া চাচ্ছে আকাশচুম্বী। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তিন গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে টার্মিনালে এসেছি। ঈদের আনন্দ তো পথেই অর্ধেক শেষ, এখন বাকি পথটা যেন ঠিকঠাক পার হতে পারি।
এদিকে, টার্মিনালগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। টার্মিনালের ভেতর ও বাইরে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য, কমিউনিটি পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
জানা গেছে, ঈদের দিন এবং এর পরবর্তী আরও পাঁচ দিন দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে এই বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানা গেছে। যদিও এই বৃষ্টি তীব্র গরম থেকে শহরবাসীকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, তবে ঈদযাত্রার চিরচেনা আনন্দের শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততাকে পুরোপুরি ম্লান করে দিয়েছে। তবুও প্রকৃতির এই বৈরী রূপ কে মেনে নিয়েই প্রিয়জনের সাথে ঈদ কাটানোর মুহূর্তকে চিন্তা করেই হাসিমুখে এই কষ্ট মেনে নিচ্ছে নাড়ির টানে রাজধানী ছেড়ে যাওয়া নগরবাসী।