ঢাকা: দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে মধ্যমেয়াদি কৌশল ঘোষণা করেছে সরকার। আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা, মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রভাব এখনও অর্থনীতিতে বিদ্যমান থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংস্কার ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।
অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থনীতির পুনর্গঠনে সরকার তিন ধাপের ‘৩ আর (Recovery and Stabilization, Restoration এবং Reconstruction for Acceleration)’ কৌশল গ্রহণ করেছে। প্রথম ধাপে এক বছরের পুনরুদ্ধার কার্যক্রম, দ্বিতীয় ধাপে এক থেকে তিন বছরের উত্তরণ এবং তৃতীয় ধাপে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় জোরদার করা হবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করে স্থিতিশীল বিনিময় হার বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের কথাও ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব প্রশাসনকে পৃথক করা হবে এবং কর ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনা হবে। বর্তমান ৬ দশমিক ৮ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাত ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য বর্তমান ‘মধ্যম’ ঝুঁকির ঋণমান থেকে আবার ‘নিম্ন’ ঝুঁকির অবস্থায় ফিরে যাওয়া। এজন্য রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং বাজেট ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখার মাধ্যমে ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে মধ্যমেয়াদি কৌশলের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর কথা জানান তিনি। এ ছাড়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণে চলতি অর্থবছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের তথ্যও তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক করপোরেট গভর্ন্যান্স ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ অর্থায়নের জন্য করপোরেট বন্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক, মিউচুয়াল ফান্ড ও পৌর বন্ড চালুর মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে শিল্প, সেবা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আধুনিক কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামো বহাল থাকায় মূল্যস্ফীতির প্রভাবে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, নতুন বাজেট ও মধ্যমেয়াদি নীতিকৌশল বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করে তুলবে।