ঢাকা: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের জন্য একগুচ্ছ যুগান্তকারী ও আধুনিক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এ সময় জাতীয় সংসদে এই খাতের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আইসিটি এবং টেলিকম সেক্টর আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। তবে সরকারের সুনির্দিষ্ট ও যথাযথ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান ১০ শতাংশে উন্নীত করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইন্টারনেট সেবায় সংস্কার ও ফাইভ-জি চালুর উদ্যোগ
দেশব্যাপী সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে দেশের সব বিমানবন্দর, ৭টি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশন এবং দূরপাল্লার আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে বিশ্বমানের উচ্চগতির ফ্রি ইন্টারনেট সেবা চালু করা হয়েছে। গত চার মাসে নতুন করে ৪১ লাখ ফোর-জি মোবাইল সংযোগ এবং ৪ লাখ উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতায় আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের কাছে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সব মোবাইল অপারেটর ও অংশীজনদের সাথে কাজ শুরু করেছে সরকার। এছাড়া শহর ও গ্রাম নির্বিশেষে দেশজুড়ে ১০০ এমবিপিএস থেকে ১ জিবিপিএস গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও গ্লোবাল হাব
নাগরিকদের সরকারি ও বেসরকারি সেবা প্রাপ্তি আরও সহজ, নিরাপদ এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি নিশ্চিত করতে ‘ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ গড়ে তোলা হবে। এর আওতায় দেশে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ ব্যবস্থা চালু করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে দেশ-বিদেশের প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তাদের নিয়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। বেসরকারি খাতের অংশীজন ও ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়ে সময়োপযোগী আর্থিক প্রণোদনা ও রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি শীর্ষস্থানীয় ‘গ্লোবাল ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে রূপান্তর করার কাজও শুরু হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তরুণদের মেধার বিকাশ
প্রস্তাবিত বাজেটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক্স শিল্প এবং তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তিকে জাতীয় উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এআই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ‘স্মার্ট সিটি’ বিনির্মাণ, নাগরিক সেবাকে জনবান্ধব করা এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় এআই অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। সরকার প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে এবং দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ‘এআই ড্রিভেন ডাটা সেন্টার’ ব্যবহার করবে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে তরুণদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন এবং এআই নির্ভর নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে।
৫০০ কোটি টাকার বিশেষ ‘স্টার্ট-আপ তহবিল’
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের এই বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিশেষ প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ মূলত ‘স্টার্ট-আপ তহবিল’ হিসেবে ব্যবহৃত হবে, যা দেশে নতুন নতুন প্রযুক্তি-উদ্যোক্তা তৈরি, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা ও নারী উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ করা হবে।