Thursday 11 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব বাড়ানো ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জিং বাজেট

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১১ জুন ২০২৬ ১৬:১১ | আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ ১৬:৪১

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ অর্থবছর। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, বিপর্যস্ত আর্থিক খাত সংস্কার ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবারের বাজেটে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুরে জাতীয় সংসদে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রস্তাবিত এ বাজেট পেশ করেন। একই সঙ্গে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটও উপস্থাপন করেন তিনি। এ ছাড়া প্রস্তাবিত ‘অর্থ অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রকাশ করা হয়েছে।

এবারের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম হচ্ছে- ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’।

বিজ্ঞাপন

প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত মে-তে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। আগামী অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রস্তাবিত বাজেটে নানা ধরনের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা।

অন্যদিকে রাজস্ব আয়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রস্তাবিত বাজেটে করভিত্তি সম্প্রসারণ, করহার বাড়ানো, কর হার পুনর্বিন্যাস,ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবা ব্যয় ও মাশুল বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাজেটে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, আইসিটি-টেলিযোগাযোগ ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাত, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন ও ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাজেটের আকার

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এটি জিডিপি’র ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা (জিডিপি’র ১২ দশমিক ৬ শতাংশ)।

অন্যদিকে সংশোধিত বাজেটে আকার ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। সে হিসাবে এবারের বাজেটের আকার বেড়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

রাজস্ব আদায়

প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অর্থায়ন তথা রাজস্ব আদায়। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি’র অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাপ্তির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। চলতি বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ন্ত্রিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া এনবিআর-বহির্ভূত কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। আর কর ব্যতীত প্রাপ্তির (এনটিআর) লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা।

চলতি বাজেটে এনবিআর নিয়ন্ত্রিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া এনবিআর-বহির্ভূত কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত প্রাপ্তির (এনটিআর) লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪৬ হাজার কোটি টাকা।

বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন

প্রস্তাবিত বাজেটে অনুদান ছাড়া সার্বিক ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপি’র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছিল ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। এটিও ছিল জিডিপি’র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। সংশোধিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। এটি জিডিপি’র ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

বাজেট ঘাটতি পূরণে আগামী বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নিট ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা (সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত খাত থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা) ঋণ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ এবং ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা অনুদান প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে নিট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।

এদিকে বাজেট ঘাটতি পূরণে বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। এর বিপরীতে সংশোধিত বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ১৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। চলতি মূল বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২১ হাজার কোটি টাকা।

বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে নেওয়া হয়েছে ৯৫ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

কোন খাতে কত ব্যয়

প্রতিবারের মত এবারও বাজেটে পরিচালনা ও অন্যান্য খাতে (অনুন্নয়ন) ব্যয় বাড়ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এসব খাতে মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে এ খাতে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। সংশোধিত বাজেটে এটি বেড়ে ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে পরিচালন ব্যয় বাবদ ৫ লাখ ৫১ হাজার ৮৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে এ খাতে মূল বরাদ্দ ছিল ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১৩ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ ১ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হবে। বিদায়ী অর্থবছরে এ খাতে মূল বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটে এটি বেড়ে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া ভর্তুকি প্রণোদনা ও নগদ ঋণ খাতে নতুন বাজেটে ১ লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে এ খাতে মূল বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বাজেটে এটি ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।

উন্নয়ন ব্যয়/বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)

প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এডিপি’র আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এটি কাটছাঁট করে ২ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর