ঢাকা: ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করে দক্ষ, নৈতিক ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জিডিপির ২ শতাংশ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা বা জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
বাজেট বক্তব্যে বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষা খাতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হবে। এ লক্ষ্যে শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকার প্রধান তারেক রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষা কারিকুলাম পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়। নতুন কারিকুলামে নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বের গুণাবলি ও মানবিক চরিত্র গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষার ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সহায়ক পরিবেশ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজস্ব মেধা ও আগ্রহ অনুযায়ী দক্ষ কারিগর, প্রযুক্তিবিদ, কৃষি উদ্যোক্তা, গবেষক, শিল্পী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী বা ক্রীড়াবিদ হিসেবে সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। জাপানিজ, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ভাষা শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী তৃতীয় ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা সম্প্রসারণের পাশাপাশি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের স্কুল ইউনিফর্ম, জুতা ও স্কুলব্যাগ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, সহায়ক প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালু করে ধাপে ধাপে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের জন্য স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ জোরদার, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ও ইন্টার্নশিপ সুবিধা বৃদ্ধি এবং স্টার্টআপ কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সরকার ‘ব্রেইন ড্রেইন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে বিদেশে অবস্থানরত উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে। গবেষণা ও উদ্ভাবনে কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মাদরাসা শিক্ষায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনার কথাও বাজেট বক্তৃতায় তুলে ধরা হয়েছে।
সরকারের ভাষ্য, একটি দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মমুখী রূপ দেওয়া হবে, যাতে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে।