ঢাকা: বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যান (ইভি) চালুর সম্ভাবনা উজ্জ্বল হলেও বিদ্যুৎ সংকট, চার্জিং অবকাঠামোর ঘাটতি, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং উচ্চ প্রাথমিক ব্যয় এখনো বড় বাধা বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তার মতে, উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে ইভিভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থায় যেতে হবে। একই সঙ্গে সরকার, বেসরকারি খাত ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়।
শনিবার (২৭ জুন) ঢাকায় ডিসিসিআই ও বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহন: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক উপস্থাপনায় এসব কথা বলেন তিনি।
তাসকীন আহমেদ বলেন, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত মোট যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৭ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেল প্রায় ৫০ লাখ। অথচ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান (ই-রিকশা) বাদ দিলে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা মাত্র ৬৬৯টি। অন্যদিকে দেশে আনুমানিক ৬০ লাখ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান চললেও সেগুলোর বড় অংশই অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। একই সময়ে দেশের পরিবহন খাতে মোট পেট্রোলিয়াম জ্বালানির ৬৩ শতাংশের বেশি ব্যবহৃত হয়, যা জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
তিনি জানান, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের যানবাহনের অন্তত ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা।
উপস্থাপনায় বলা হয়, বিশ্বের নতুন গাড়ি বিক্রির প্রায় এক-চতুর্থাংশ এখন বৈদ্যুতিক হলেও মোট যানবাহনের বহরে ইভির অংশ এখনো মাত্র ৫ শতাংশের মতো। নরওয়েতে নতুন গাড়ি বিক্রির প্রায় ৯৭ শতাংশই বৈদ্যুতিক, চীনে নতুন গাড়ি বিক্রির ৫৪ শতাংশ এবং ভারতের তিন চাকার যানবাহন খাতে বৈদ্যুতিক গাড়ির অংশ ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এসব দেশের সাফল্যের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি নীতি, কর ছাড়, চার্জিং অবকাঠামো এবং সরকারি প্রণোদনা বড় ভূমিকা রেখেছে।
সভাপতি বলেন, সরকার স্থানীয়ভাবে ইভি উৎপাদন ও সংযোজনের জন্য শুল্ক ও কর ছাড়, চার্জিং যন্ত্রপাতিতে কম আমদানি শুল্ক, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামে কর অব্যাহতি, ইভি কেনার ঋণসীমা ৬০ লাখ থেকে ৮০ লাখ টাকায় উন্নীত করাসহ বিভিন্ন সুবিধা দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্যুৎ সরবরাহ। বর্তমানে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। এ অবস্থায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ নিশ্চিত না করে ব্যাপকভাবে বৈদ্যুতিক যান চালু করা কঠিন হবে।
উপস্থাপনায় বাংলাদেশে ইভি বিস্তারের ক্ষেত্রে ছয়টি প্রধান প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশনের অভাব, বৈদ্যুতিক গাড়ির উচ্চ প্রাথমিক মূল্য
বাস ডিপো ও চার্জিং অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, ব্যাটারির নিরাপত্তা, পরীক্ষাগার ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার দুর্বলতা, ব্যাটারি পরিবর্তনের ব্যয় ও বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তা,
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট।
তাসকীন আহমেদ বলেন, এসব সমস্যার সমাধান না করে শুধু কর ছাড় দিয়ে ইভি খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল হবে ধাপে ধাপে ইভিতে রূপান্তর। প্রথমে দুই ও তিন চাকার যান স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। এরপর ঢাকা ও চট্টগ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, চার্জিং প্রযুক্তির মান একীভূত করতে হবে, নতুন ভবনে ইভি-প্রস্তুত পার্কিং ও চার্জিং সুবিধা বাধ্যতামূলক করা উচিত এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি মহানগরগুলোতে প্রথম পর্যায়ে ৩০০ থেকে ৫০০টি সরকারি অর্থায়নে বৈদ্যুতিক বাস চালুরও সুপারিশ করেন তিনি। বৈদ্যুতিক যান শুধু পরিবেশবান্ধব পরিবহন নয়, এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।