কুড়িগ্রাম: দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে প্রতিবছর তিস্তার ভাঙ্গনে নিঃস্ব হচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, গাছপালা, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা ও মন্দিরসহ নানা স্থাপনা। ভাঙনের কবলে পড়ে হাজার হাজার হেক্টর আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে মানুষের বাস্তুচ্যুতি, অন্যদিকে কমছে কৃষিজমি ও জীবিকার সুযোগ।
তিস্তার ভাঙ্গনে যেন নদীপাড়ের মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। বছরের পর বছর ধরে ভাঙ্গনের শিকার হয়ে অনেক পরিবার একাধিকবার বসতভিটা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। কেউ ঘর সরিয়ে নিচ্ছেন নিরাপদ স্থানে, আবার কেউ শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন অন্যের জমি কিংবা বাঁধের ওপর।র্ নদীভাঙনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষের অনিশ্চয়তা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিস্তা নদীর ভাঙ্গন ও বন্যা থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পেতে দীর্ঘদিন ধরে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানানো হলেও বাস্তবে বড় ধরনের অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে সরব হলেও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সেই তৎপরতা অনেকটাই কমে গেছে বলে মনে করছেন নদীপাড়ের মানুষ।

ঘড়িয়ালডাঙ্গার চর খিতাবখাঁ গ্রামের বাসিন্দা রেণু বেগমও (৬০) নদীভাঙ্গনে ফসলি জমি, পুকুর, বাগানসহ বসতভিটা হারিয়েছেন। এই নারী একসময় তিনবারের ইউপি সদস্য ছিলেন। এখন তীররক্ষা বাধে পরিবার নিয়ে থাকেন। এই নারী বলেন এই নদী আমাদেরকে ধনী থেকে ফকির বানিয়েছে।
ভাঙ্গন কবলিত এলাকার ছবুর আলী (৬৫) বলেন, ‘আমার বাড়ি ১৭ বার নদীতে ভেঙে গেছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে ভাঙ্গন রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে।’
তবে সরকারের পক্ষ থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আশার কথা বলা হয়েছে। গত ১ অক্টোবর এক প্রশ্নের জবাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, কারিগরি সমীক্ষা শেষ হলে আগামী অর্থবছরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে।
এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তিস্তার দুই পাড়ের দুই কোটি মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন হবে।তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় নদীশাসন, ভাঙ্গন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি এবং তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, শুধু পাইলট প্রকল্পের ঘোষণা নয়, দ্রুত বাস্তবায়নের দৃশ্যমান কার্যক্রম শুরু করতে হবে।
নদীপাড়ের মানুষের ভাষ্য, প্রতিটি বর্ষায় তারা নতুন করে ভাঙ্গনের আতঙ্কে থাকেন। একটি পরিবার যখন ঘর সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেয়, পরের বছর সেখানেও ভাঙ্গন শুরু হয়। এভাবে বছরের পর বছর চলতে থাকলে শুধু বসতভিটা নয়, হারিয়ে যাবে কৃষিজমি ও মানুষের স্থায়ী ঠিকানাও।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা নদীপাড়ের মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস মিলেছে। এবার আগামী অর্থবছরে পাইলট প্রকল্প চালুর ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই এখন তাদের প্রধান প্রত্যাশা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন আর কত বসতভিটা, ফসলি জমি ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হলে তিস্তা মহাপরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে? তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং তিস্তাপাড়ের মানুষের ভাঙ্গন-আতঙ্কের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হবে।
উল্লেখ্য, তিস্তা নদী ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নদিটির দৈঘ্য ৩১৫ কিলোমিটার হলেও বাংলাদেশ অংশে লালমনিরহাট ও রংপুর হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হয়েছে ১১৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট, উলিপুর ও চিলমারী এলাকায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা জুরে বিসতৃত।